দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক বছরের কিছু বেশি সময় কারাগারে কাটিয়ে মুক্তি পেয়েছেন বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের সাবেক মেয়র তথা আওয়ামী লিগের জনপ্রিয় নেত্রী সেলিনা হায়াত আইভি। বুধবার বেশি রাতে ঢাকার অদূরে গাজীপুরে অবস্থিত কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।
তাঁর বিরুদ্ধে দুটি হত্যার চেষ্টা এবং বিস্ফোরক আইনসহ মোট বারোটি মামলা বিচারাধীন। হাইকোর্ট এবং শীর্ষ আদালত তাঁর জামিল বহাল রাখায় বুধবার রাতে কারা কর্তৃপক্ষ তাঁকে মুক্তি দেয়। তাঁর জামিনে মুক্তিকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহল। আওয়ামী লিগের অন্দরেও সেলিনার জামিনে মুক্তি নিয়ে নানা চর্চা আছে।
সাম্প্রতিক অতীতে আওয়ামী লিগের আরো কয়েকজন নেতা-নেত্রী জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তবে অধিকাংশ নেতাই কারাগার থেকে বের হতে পারেননি। জেল গেটেই তাদের ভিন্ন মামলায় গ্রেফতার করে পুলিশ। সেলিনার ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটেনি। তিনি জেলগেটে কালক্ষেপ না করে গাড়ি ছুটিয়ে নারায়ণগঞ্জের বাড়িতে চলে যান।
বেশি রাতে বাড়িতে সাংবাদিকদের কাছে তাঁর তিন লাইনের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। জামিন পাওয়ায় তিনি বিচার বিভাগের পাশাপাশি তারেক রহমান সরকারকেও কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। আশা ব্যক্ত করেছেন সকলে মিলে একটি মানবিক সরকার গড়ে তোলা সম্ভব। সেই সঙ্গে কারাবন্দি অন্য মহিলাদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে আওয়ামী লিগের রাজনীতি, আগামী দিনের দলে তাঁর ভূমিকা কী হবে সে বিষয়ে কোন প্রতিক্রিয়া দেননি এই নেত্রী। বৃহস্পতিবার এ নিয়ে মুখ খোলেন কিনা তা নিয়ে কৌতূহল রয়েছে।
আওয়ামী লিগ যখন তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে দমন পীড়নের অভিযোগে সরব তখন সেলিনা কেন জামিনে মুক্তি নিয়ে সরকারকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন তা নিয়ে জল্পনা আছে। বিশেষ করে তাঁর জামিন আটকাতেও যখন সরকার সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত আপিল করেছিল তখন সেই সরকারকে কেন ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা দিলেন এই নেত্রী তাঁর কোন স্পষ্ট ব্যাখ্যা মিলছে না। তবে কোন কোন মহল থেকে বলা হচ্ছে এটা নিছকই সৌজন্য।
গত বছর ৮ মে গ্রেফতার হওয়ার অববাহিত আগে সেলিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তুমুল চর্চা শুরু হয়েছিল। প্রচার হয় শেখ হাসিনা দেশে না থাকায় সেলিনা হায়াত আইভি দলের হাল ধরবেন। ২০২৪ এর ৫ অগস্ট গণঅভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লিগের প্রথম সারির নেতারা এলাকা ছাড়লেও নারায়ণগঞ্জের দীর্ঘদিনের সাবেক মেয়র আইভি শহরে নিজের বাড়িতেই ছিলেন। সীমিত আকারে দলীয় কাজকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গণঅভ্যুত্থানের পর দেশব্যাপী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্ট্যাচু ভাঙচুর হচ্ছিল। সেই সময় ১৫ অগস্ট বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদিনে নারায়ণগঞ্জের দলীয় দপ্তরে নেতার স্ট্যাচুতে ফুল মালা দিয়ে শ্রদ্ধা জানান এই নেত্রী।
সেই তিনি দলের হাল ধরতে পারেন এই খবর চাউর হতেই সরকার তাঁকে গ্রেফতার করে একাধিক মামলায়। বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তিনি নারায়ণগঞ্জে দমন পীড়নে যুক্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়। পরে দুটি হত্যার চেষ্টা মামলাতেও তার নাম জড়ায় পুলিশ। তিনি গ্রেফতার হওয়ার আগে জল্পনা ছিল বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি তথা আওয়ামী লিগ নেতা আব্দুল হামিদকে সভাপতি এবং সেলিনাকে সাধারণ সম্পাদক করে দল পরিচালনা করা হবে। এই প্রচারের মাঝেই সেলিনা গ্রেফতার হয়ে যান।
বুধবার রাতে কারাগার থেকে বেরনোর পর তিনি তাঁর আইনজীবী মারফত জানিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের আগামী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। তবে শেখ হাসিনার বিশেষ স্নেহধন্য এই নেত্রী আওয়ামী লিগের হয়ে নির্বাচন লড়বেন কিনা তা স্পষ্ট করেননি।
শেখ হাসিনার বিগত ১৬ বছরে শাসনামলে সেলিনা হায়াত আইভি ছিলেন আওয়ামী লিগের জনপ্রিয় নেতা-নেত্রীদের অন্যতম। যদিও তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্দর শহর নারায়ণগঞ্জের মধ্যেই সীমিত ছিল। তবে গোটা বাংলাদেশ তাঁকে এক ডাকে চেনে। আওয়ামী লিগের সঙ্গেও তার পরিবারের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক। আপনার বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সহযোগী। বিদেশে ডাক্তারি পড়ে দেশে ফেরার পর তিনি বাবার পথ ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়ান।
তিনি ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ছিলেন। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনটি নির্বাচনে জয়ী হন। ২০১১ সালে প্রথম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী আওয়ামী লিগ নেতা শামীম ওসমানকে এক লাখের বেশি ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে আইভী মেয়র নির্বাচিত হন। তিনি সব সময় নারায়ণগঞ্জে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সরব ছিলেন।

