দ্য ওয়াল ব্যুরো: সলমন খানকে ঘিরে নতুন বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে 'কালা হিরণ'। ছবিটির মুক্তি ও প্রচার বন্ধের দাবিতে ইতিমধ্যেই নির্মাতাদের কাছে আইনি নোটিস পাঠিয়েছে সলমন খানের আইনজীবী দল। পোস্টার প্রকাশের পর থেকেই ছবিটি নিয়ে জল্পনা তুঙ্গে। অনেকেরই ধারণা, ১৯৯৮ সালের বহুল আলোচিত ব্ল্যাকবাক শিকার মামলার (Salman Khan, Black buck salman, kala hiran) ঘটনাপ্রবাহ এবং সেই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় মুখ সলমন খানকে ঘিরেই তৈরি হয়েছে এই সিনেমা।
যদিও ছবির নির্মাতারা শুরু থেকেই দাবি করে আসছেন, এটি কোনও ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বানানো নয়, বরং জনসমক্ষে বহুল পরিচিত কিছু ঘটনার অনুপ্রেরণায় নির্মিত একটি ফিচার ফিল্ম।
আইনি নোটিস পৌঁছানোর আগেই এক সাক্ষাৎকারে ছবির পরিচালক ভারত শ্রীনাতে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছিলেন। তবে সিনেমা তৈরির আগে তিনি সলমন খান কিংবা তাঁর ঘনিষ্ঠ কারও অনুমতি নিয়েছিলেন কি না, সেই প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট উত্তর এড়িয়ে যান।
পরিচালকের বক্তব্য, কার কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া হয়েছে বা আদৌ নেওয়া হয়েছে কি না, সেই বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছু বলতে চান না তিনি। তাঁর মতে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সবারই রয়েছে। এমন একটি মামলার ক্ষেত্রে আলাদা করে অনুমতির প্রয়োজন আছে বলেও তিনি মনে করেন না। কারণ, ঘটনাটি আদালতে বিচারাধীন ছিল, রায়ও হয়েছে, এবং গোটা দেশ সেই ঘটনার সঙ্গে পরিচিত।
সম্ভাব্য আইনি লড়াই নিয়েও বেশ আত্মবিশ্বাসী শোনায় পরিচালককে। তাঁর দাবি, এই ছবি ঘিরে কোনও ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জ এলেও তার মোকাবিলার জন্য তাঁদের প্রস্তুতি সম্পূর্ণ। এমনকি তিনি বলেন, যে মামলায় দেশের অন্যতম প্রভাবশালী তারকাকেও দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল, সেই মামলার সঙ্গে যুক্ত এক ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া একটি চিঠিকে ভিত্তি করেই ছবির নির্মাণ। সেই কারণে তাঁদের আইনজীবী দল সুপ্রিম কোর্ট থেকে হাই কোর্ট, সর্বত্র লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। তাঁর কথায়, এই ছবি থামিয়ে দেওয়া এত সহজ হবে না।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা তৈরি করেছে ছবির পোস্টার। কারণ পোস্টারে দেখা চরিত্রটির সঙ্গে সলমন খানের চেহারার মিল খুঁজে পেয়েছেন বহু দর্শক। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ ভারত শ্রীনাতে। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, কোথাও তিনি বলেননি যে ছবির চরিত্রটি সলমন খান। তাঁর দাবি, তিনি শুধুমাত্র ১৯৯৮ সালের একটি ঘটনাকে পর্দায় তুলে ধরেছেন। কেউ যদি সেই চরিত্রে অন্য কাউকে দেখতে পান, তা সম্পূর্ণ তাঁদের নিজস্ব ব্যাখ্যা।
পরিচালকের কথায়, ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র 'আয়ান খান'-এর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেতা কাশিফ ইকবাল খান। পোস্টারে যাঁকে দেখা যাচ্ছে, তিনি এই অভিনেতাই। চেহারাগত মিল থাকতেই পারে, কিন্তু সেটিকে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতিরূপ বলে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না বলেই মত তাঁর।
কেন এই গল্প নিয়ে ছবি বানানোর সিদ্ধান্ত? সেই প্রশ্নের জবাবেও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন পরিচালক। তিনি জানান, 'উদয়পুর ফাইলস'-এর কাজ করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় রাজস্থানে কাটিয়েছিলেন। সেই সময় বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের জীবনযাপন, সংস্কৃতি এবং বন্যপ্রাণীর প্রতি তাঁদের গভীর আবেগ সম্পর্কে কাছ থেকে জানার সুযোগ হয়েছিল।
শ্রীনাতের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে হরিণ কেবল একটি প্রাণী নয়, পরিবারের সদস্যের মতো। এমনও দেখা যায়, হরিণশাবককে নিজের সন্তানের মতো লালন-পালন করা হয়, এমনকি মায়েরা বুকের দুধ পর্যন্ত খাওয়ান। ফলে তাঁদের কাছে কোনও হরিণের মৃত্যু নিছক শিকার নয়, বরং প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণার সমান।
এই আবেগ থেকেই ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে বলে দাবি পরিচালকের। তাঁর মতে, বহু মানুষ আজও জানতে চান কেন গ্যাংস্টার লরেন্স বিষ্ণোই সলমন খানের প্রতি এতটা বিদ্বেষ পোষণ করেন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বারবার ফিরে আসতে হয় ব্ল্যাকবাক শিকার মামলার প্রসঙ্গে। আদালতকেন্দ্রিক নাটকীয়তার মাধ্যমে সেই প্রেক্ষাপটই তিনি দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
তবে ছবি তৈরির ক্ষেত্রে লরেন্স বিষ্ণোইয়ের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ করা হয়েছিল কি না, সেই জল্পনাও উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, লরেন্স বর্তমানে জেলে রয়েছেন। তাঁর সঙ্গে কথা বলার কোনও প্রয়োজনই ছিল না। কারণ তাঁর সম্পর্কে যা জানার, তার অধিকাংশই ইতিমধ্যেই জনসমক্ষে রয়েছে। আর ছবিতে তিনি কেবল সেই পরিচিত তথ্যগুলিকেই উপস্থাপন করছেন।
এদিকে শিকারকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন ব্যক্তিকে ছবিতে দেখা যেতে পারে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন পরিচালক। তবে কারা থাকছেন বা কীভাবে সেই অধ্যায়কে দেখানো হয়েছে, সে বিষয়ে মুখে কুলুপ এঁটেছেন তিনি। দর্শকদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে জানিয়েছেন, সব প্রশ্নের উত্তর মিলবে ছবির টিজার প্রকাশের পর।
একদিকে সলমন খানের পক্ষ থেকে আইনি চাপ, অন্যদিকে নির্মাতার একের পর এক সাহসী দাবি। ফলে 'কালা হিরণ' এখন শুধুমাত্র একটি সিনেমা নয়, বরং বিতর্ক, কৌতূহল এবং আইনি লড়াইয়ের এক জটিল সংযোগস্থল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পর্দায় যে গল্প উঠে আসবে, তা কি সত্যিই শুধুই একটি পুরনো ঘটনার পুনর্নির্মাণ, নাকি দর্শক সেখানে আরও অনেক অচেনা ইঙ্গিত খুঁজে পাবেন? সেই উত্তরই এখন অপেক্ষার কেন্দ্রবিন্দু।

