বাংলা তো বটেই, ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসেও বোধহয় তাঁর নাম থেকে যেতে পারে। গিনেস বুক, লিমকা বুক অফ রেকর্ডেও তাঁর নাম উঠলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। তৃণমূল ভূমিষ্ঠ হওয়ার সময় থেকে রাজ্য সভাপতি। সেই তিনি, সুব্রত বক্সীর ক্ষমতা যে খর্ব হয়ে গেছিল, তা বিধানসভা ভোটের প্রার্থীতালিকা ঘোষণার সময়েই বোঝা যায়।
কালীঘাটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন অর্ধেক প্রার্থীতালিকা ঘোষণা করে বাকিটা পড়ার জন্য লিস্টটি অভিষেকের হাতে তুলে দেন, তখনও কেবল আনুষ্ঠানিক উপস্থিতি ছাড়া তাঁর আর কোনও ভূমিকাই ছিল না। এমনকি দেখা যায়, তালিকাটি হাতে পেয়েই এপাতা-ওপাতা উল্টেপাল্টে দেখছেন 'বক্সীদা'।
দ্য ওয়ালে আগেই লেখা হয়েছিল, সুব্রত বক্সীর সুপারিশ মতো প্রার্থী তালিকায় কোনও নামই হয়তো থাকবে না। সেই তালিকা তৈরিতে তাঁর তো কোনও ভূমিকা ছিলই না, এমনকি তাঁর একান্ত অনুগত সৈনিক জয়প্রকাশ মজুমদার, তাঁকেও টিকিট দিতে পারেননি তৃণমূলের এই বর্ষীয়ান রাজ্য সভাপতি।
এবার এই প্রথম দেখা গেল, এই আনুষ্ঠানিকতার ফ্রেম থেকেও বেরিয়ে গেলেন বক্সীবাবু।
২০২৪ সালে লোকসভা ভোটের গণনার ঠিক আগে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ভার্চুয়াল বৈঠক করেছিলেন তৃণমূলের সমস্ত সাংসদ ও জেলা সভাপতিদের সঙ্গে। গতকাল তার পুনরাবৃত্তি হয়েছে। অভিষেক ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দু'জনেই বৈঠক করেছেন সব প্রার্থীর সঙ্গে এবং তাঁদের এজেন্টদের সঙ্গে। কিন্তু গাঢ় নীল ব্যাকগ্রাউন্ডের সামনে শুধু দিদি আর অভিষেকই বসেছিলেন। 'বক্সীদা'র আসন ছিল না।
কেন ছিল না? সুব্রত বক্সীর ঘনিষ্ঠ সূত্রে বলা হচ্ছে, দাদার শরীরটা ভাল যাচ্ছে না। আবার তাঁর কাছের কিছু মানুষ বলছেন, মনটাও ভাল নেই।
এবার রাজ্যসভার ভোটে সুব্রত বক্সী আর পুনর্মনোনয়ন চাননি বলেই তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি। দলের সহ-সভাপতি হলেন জয়প্রকাশ। ঘরোয়া মহলে তাঁকে তৃণমূলের অনেকেই 'জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট' বলেন। সূত্রের দাবি, বক্সীবাবু জয়প্রকাশকে রাজ্যসভায় পাঠানোর দরখাস্ত করেছিলেন। সেটা তো হয়ইনি, বাকি কিছুই আর হয়নি।
আবার, কালীঘাট-ঘনিষ্ঠ এক নেতার কথায়, সুব্রত বক্সীকে বলা হয়েছিল, এই বিধানসভা ভোটে বালিগঞ্জ আসনে প্রার্থী হতে। এটা সেই গত নভেম্বরের কথা। তাতেও রাজি হননি রাজ্য সভাপতি।
কারণ, তিনি সম্ভবত দেওয়াল লিখন পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলেন, তৃণমূলের বৃদ্ধতন্ত্র বঙ্গোপসাগরের দিগন্তে ঢলে পড়ছে। দলের কর্তৃত্ব ক্রমশই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত থেকে চলে যাচ্ছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে। এবং এই সেই সন্ধিক্ষণ, যার ওপারে তৃণমূলের সংগঠনের সবটাই অভিষেক। রাজ্য সভাপতি পদে তাঁর মেয়াদ ফুরোনোও তাই সময়ের অপেক্ষা মাত্র।
কিন্তু শুরুর আগেও যেমন শুরু থাকে, তেমনি শেষের আগের শেষটাও দেখা গেল শনিবাসরীয় সন্ধেয়।

