দ্য ওয়াল ব্যুরো: বাংলা রাজনীতিতে অভিনেতা অনেকেই এসেছেন। কেউ ভোটে জিতেছেন, কেউ হেরেছেন। কেউ-কেউ আবার ক্ষমতার খুব কাছাকাছি গিয়েও জনমানসে গ্রহণযোগ্যতা হারিয়েছেন। কিন্তু দেবের রাজনৈতিক সফরটা বরাবরই খানিক আলাদা। কারণ তিনি কখনও শুধুমাত্র একজন রাজনৈতিক প্রতিনিধি হয়ে ওঠেননি, আবার নিছক তারকাও হয়ে থাকেননি।
দুই পরিচয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য একটি স্বতন্ত্র জায়গা তৈরি করেছেন।
তাই শুক্রবার রাতে 'ফেরা' ছবির প্রিমিয়ারে তাঁর কয়েকটি মন্তব্য ঘিরে যে চর্চা শুরু হয়েছে, তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, টলিউডের অন্দরমহলের জন্যও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ।
এদিন নতুন সরকারকে সময় দেওয়ার কথা বলতে শোনা গেল দেবকে। তাঁর যুক্তি, একটি নতুন প্রশাসনের কাজের মূল্যায়ন করতে গেলে ধৈর্য প্রয়োজন। মন্ত্রিসভা এখনও সম্পূর্ণ হয়নি, নীতি নির্ধারণের কাজ চলছে, ফলে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ফলাফল চাওয়া বাস্তবসম্মত নয়। এই পর্যন্ত সবটাই ছিল একজন দায়িত্বশীল সাংসদের সংযত মন্তব্য।
তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে তাঁর পরের কথাগুলি। দেব বলেন, নতুন সরকারের আমলে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের জন্য আরও ভাল পরিবেশ তৈরি হবে বলেই তাঁর বিশ্বাস। আর সেই বিশ্বাসের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, আগের সরকারের সময় তিনি যে ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছেন, অন্তত সেই পরিস্থিতি এবার হবে না বলেই আশা করছেন।
একটি মাত্র বাক্য। অথচ সেই বাক্যের মধ্যেই যেন লুকিয়ে রয়েছে গত কয়েক বছরের বাংলা বিনোদন জগতের বহু অপ্রকাশিত গল্প।
কারণ দেব এমন একজন ব্যক্তি, যিনি কখনও রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে নিজের পেশাগত সম্পর্ককে সীমাবদ্ধ রাখেননি। বাংলা ইন্ডাস্ট্রিতে যখন রাজনৈতিক বিভাজন ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে, তখনও তাঁকে দেখা গিয়েছে ভিন্ন মতাদর্শে বিশ্বাসী শিল্পীদের সঙ্গে একই ফ্রেমে কাজ করতে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং পেশাদারিত্বকে রাজনৈতিক আনুগত্যের ঊর্ধ্বে রাখার চেষ্টা বরাবরই করেছেন তিনি।
এই কারণেই বহু সময় তাঁকে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখেও পড়তে হয়েছে বলে ইন্ডাস্ট্রির অন্দরে আলোচনা রয়েছে। তবে প্রকাশ্যে সংঘাতে না গিয়ে নিজের কাজ এবং অবস্থান—দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়েছেন দেব।
আসলে গত কয়েক বছরে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম আলোচিত শব্দ ছিল 'নিষিদ্ধ সংস্কৃতি'। কে কোথায় কাজ করবেন, কার সঙ্গে কাজ করবেন, কোনও শিল্পীর রাজনৈতিক অবস্থান তাঁর পেশাগত সুযোগকে প্রভাবিত করবে কি না—এসব প্রশ্ন বারবার উঠে এসেছে। প্রকাশ্যে অভিযোগ কম হলেও, আড়ালে অসন্তোষ ছিল প্রবল।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, সরকার পরিবর্তনের পর থেকেই দেব একাধিকবার সহযোগিতার বার্তা দিয়েছেন। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের মতো দীর্ঘদিনের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানুষের স্বার্থে যে কোনও সরকারের সঙ্গেই কাজ করতে প্রস্তুত। একইসঙ্গে বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পে সুস্থ পরিবেশ বজায় রাখা, শিল্পী-কলাকুশলীদের কাজের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা এবং কোনও ধরনের অঘোষিত বাধা যেন না থাকে—সেই প্রত্যাশার কথাও তুলে ধরেছেন।
তিনি রাজনৈতিক ময়দানে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করে শিরোনাম তৈরি করেন না। আবার প্রয়োজন হলে নিজের অভিজ্ঞতার কথাও প্রকাশ্যে আনতে দুবার ভাবেন না। তাঁর রাজনীতি বরাবরই সংঘাতের চেয়ে সংলাপকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। আর সেই কারণেই হয়তো ক্ষমতার পালাবদলের পরেও তিনি প্রতিহিংসার ভাষায় কথা বলেন না; বরং পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা বলেন।
দীর্ঘ বারো বছরের রাজনৈতিক জীবনে দেবের সবচেয়ে বড় সাফল্য সম্ভবত এটাই—তিনি নিজের তারকাখ্যাতিকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানাননি, আবার রাজনৈতিক পরিচয়কে নিজের শিল্পীসত্তার ওপরও চাপিয়ে দেননি।

