দ্য ওয়াল ব্যুরো: সরকারি স্কুলের মিড-ডে মিলে কি এবার বাচ্চাদের পাতে ডিম-মাছের বদলে শুধুই মিলবে রাজমা আর ডাল? রান্নার দায়িত্ব কি তবে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর মহিলাদের হাত থেকে কেড়ে তুলে দেওয়া হবে ইসকনের (ISKCON) মতো কোনও ধর্মীয় সংস্থার হাতে? এই সমস্ত বিতর্কিত প্রশ্ন ঘিরেই এবার কলকাতা হাইকোর্টের তীব্র টানাপড়েন।
আর আজ, বুধবার এই জনস্বার্থ মামলায় রাজ্য সরকারের কাছ থেকে হলফনামা তলব করল আদালত। আগামী চার সপ্তাহ পর এই মামলার পরবর্তী শুনানি।
আদালতে আজ ঠিক কী ঘটল?
ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তীর ডিভিশন বেঞ্চে আজ এই মামলার শুনানি চলাকালীন সওয়াল-জবাবে রাজ্য ও মামলাকারীর আইনজীবীদের মধ্যে বাগযুদ্ধ বেঁধে যায়।
মামলাকারীর পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় আদালতে জোরদার সওয়াল করে বলেন, "রাজ্যের প্রায় ১৮০০ স্কুলে মিড-ডে মিলের দায়িত্ব ইসকনকে দেওয়ার একটা প্রক্রিয়া চলছে। স্কুলছুট রুখতে এবং পড়ুয়াদের স্কুলমুখী করতেই এই পুষ্টিকর খাবার চালু করা হয়েছিল। এতদিন স্থানীয় স্তরে স্বনির্ভর গোষ্ঠীর (SHG) মহিলারা এই রান্নার কাজ করতেন। প্রায় আড়াই লক্ষ মহিলার কর্মসংস্থান জড়িয়ে রয়েছে এর সঙ্গে। এবার ইসকনকে দায়িত্ব দেওয়া হলে এই গরিব মহিলাদের রুজি-রুটিতে টান পড়বে, তাঁরা কাজ হারাবেন।"
পাল্টা রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG) সুরজিৎ নাথ মিত্র এই মামলাকে সম্পূর্ণ 'প্রিম্যাচিওর' বলে দাবি করেন। তিনি আদালতে জানান, "এই আবেদনটি পুরোপুরি অনুমানের ভিত্তিতে করা হয়েছে। পিএম পোষণ প্রকল্পের মাধ্যমে পিপিপি মডেলে সেন্ট্রালাইজড কিচেন তৈরি করার কথা বলা হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু এখনও কোনও নোটিফিকেশন জারি হয়নি। এই নীতি এখনও কার্যকরীই হয়নি, তাই মামলার কোনও গ্রহণযোগ্যতা নেই।"
এর জবাবে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় পালটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে বলেন, "তাহলে রাজ্য হলফনামা দিয়ে বলুক যে মুখ্যমন্ত্রী এই ধরণের কোনও মন্তব্য বা ঘোষণা করেননি!" দুপক্ষের সওয়াল-জবাব শেষে আদালত রাজ্যকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে হলফনামা জমা দেওয়ার নির্দেশ দেয়।
আশঙ্কার মেঘ: 'গুজরাত মডেল' কি এবার বাংলায়?
বাজেটে এই ধরণের প্রকল্পের কথা বলা হলেও, ইসকন ঠিক কীভাবে খাবার সরবরাহ করবে আর স্বনির্ভর গোষ্ঠীগুলির ভবিষ্যৎ কী হবে, তা নিয়ে নবান্ন এখনও ধোঁয়াশা বজায় রেখেছে। আর এই গোপনীয়তা নিয়েই দানা বেঁধেছে রহস্য। শিক্ষামহল এবং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করিয়ে দিচ্ছেন, গুজরাতের বহু জায়গায় মিড-ডে মিলের দায়িত্ব সামলায় ইসকন। সেখানে সম্পূর্ণ নিরামিষ এবং পেঁয়াজ-রসুনহীন খাবার দেওয়া হয়। মামলাকারীদের আশঙ্কা, তবে কি সেই নিরামিষ 'গুজরাত মডেল' এবার বাংলার স্কুলগুলিতেও চাপিয়ে দেওয়ার ছক চলছে? বাংলার সরকারি স্কুলগুলিতে মিড-ডে মিলে দীর্ঘদিন ধরেই ডিম পুষ্টির অন্যতম প্রধান উৎস। সম্পূর্ণ নিরামিষ খাদ্যতালিকা চালু হলে বাংলার দরিদ্র পরিবারের পড়ুয়ারা প্রয়োজনীয় প্রাণিজ প্রোটিন থেকে বঞ্চিত হবে।
এর নেপথ্যে কোনও 'অস্বচ্ছতা' বা 'বড় ষড়যন্ত্র' রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার আর্জি জানানো হয়েছে আদালতে। এখন দেখার, আগামী চার সপ্তাহ পর হাইকোর্টে হলফনামা দিয়ে রাজ্য সরকার এই ডিম বনাম রাজমা-ডালের বিতর্কে কী সাফাই দেয়।

