দ্য ওয়াল ব্যুরো: চব্বিশ ঘণ্টাও কাটল না। ভদ্রেশ্বর পুরসভার (Bhadreswar Municipality) চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী-সহ আট জন তৃণমূল কাউন্সিলরের নাটকীয় পদত্যাগের রেশ কাটতে না কাটতেই, এবার সেখানে ঘটে গেল আরও এক নাটকীয় ঘটনা। পুরসভার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি গায়েব বা সরিয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগে এবার গ্রেফতার হলেন ভদ্রেশ্বর পুরসভার বর্তমান ভাইস চেয়ারম্যান তথা তৃণমূল নেতা ফিরোজ খান।
পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার বা ইও-র লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতেই শুক্রবার চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের পুলিশ তাঁকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, একের পর এক ধাক্কায় এবার ভদ্রেশ্বর পুরবোর্ডটি সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবারই ভদ্রেশ্বর পুরসভার চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী এবং তাঁর অনুগামী আরও সাত জন কাউন্সিলর একসঙ্গে পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। তার পরেই নিয়ম অনুযায়ী পুরসভা সচল রাখা এবং প্রশাসনিক কাজকর্ম সামলানোর গুরুদায়িত্ব এসে পড়েছিল এই ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খানের কাঁধে। কিন্তু সেই দায়িত্ব পাওয়ার পরেই তাঁর বিরুদ্ধে খোদ পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার সরকারি ফাইল ও নথি চুরির মতো মারাত্মক অভিযোগ তোলায় তীব্র চাঞ্চল্য ছড়ায়। এই গ্রেফতারির জেরে তৃণমূলের অন্দরেই এখন প্রবল আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, হুগলি জেলার এই ঐতিহ্যবাহী পুরবোর্ডটি আর টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না এবং অচিরেই তা তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে পারে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত ফিরোজ খান হুগলির ভদ্রেশ্বরের তেলিনিপাড়া এলাকার একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী তৃণমূল নেতা হিসেবে পরিচিত। ২০২২ সালের পুরসভা নির্বাচনে দলীয় টিকিটে জিতে প্রথমবার কাউন্সিলর হন তিনি। এলাকায় তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপত্তি দেখেই দল তাঁকে সরাসরি পুরসভার ভাইস চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসায়। রাজনৈতিক মহলে ফিরোজকে চন্দননগরের প্রাক্তন বিধায়ক তথা রাজ্যের প্রাক্তন হেভিওয়েট মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনের অত্যন্ত 'আস্থাভাজন' ও ঘনিষ্ঠ অনুগামী বলেই গণ্য করা হত। তবে তাঁর বিরুদ্ধে বিতর্কের তালিকাও বেশ দীর্ঘ। এর আগেও তেলিনিপাড়া এলাকার একাধিক বড়সড় অশান্তির ঘটনায় তাঁর নাম জড়িয়েছিল। এমনকি, দিন দুয়েক আগে তিনি স্বয়ং ভদ্রেশ্বর পুরসভায় গিয়ে চরম ঝামেলা করেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
পুরসভা সূত্রে খবর, চেয়ারম্যানের ইস্তফার পর থেকেই সেখানকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ফাইলের হদিস মিলছিল না। এর পরেই পুরসভার এগজিকিউটিভ অফিসার সরাসরি ভদ্রেশ্বর থানায় যান এবং ভাইস চেয়ারম্যান ফিরোজ খানের বিরুদ্ধে সরকারি নথি গোপনে সরিয়ে ফেলার একটি লিখিত ডায়েরি করেন। সেই অভিযোগের ভিত্তিতেই শুক্রবার দুপুরে ফিরোজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় ডেকে পাঠায় পুলিশ। দীর্ঘক্ষণ তাঁর বয়ান খতিয়ে দেখার পর এবং বক্তব্যে একাধিক অসঙ্গতি মেলায় শেষ পর্যন্ত শুক্রবার বিকেলেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। চন্দননগর পুলিশ কমিশনারেটের ডিসি (চন্দননগর) জানিয়েছেন, ধৃত তৃণমূল নেতা ফিরোজের বিরুদ্ধে আরও বেশ কিছু অভিযোগ জমা পড়েছে, যা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
আগামী শনিবারই তাঁকে চন্দননগর মহকুমা আদালতে হাজির করানো হবে এবং নিজেদের হেফাজতে নেওয়ার আবেদন জানাবে পুলিশ। সব মিলিয়ে, চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে চেয়ারম্যানের ইস্তফা এবং ভাইস চেয়ারম্যানের হাজতবাস ভদ্রেশ্বর পুরসভাকে যে এক চরম প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সংকটের মুখে দাঁড় করিয়ে দিল, তা বলাই বাহুল্য।
প্রসঙ্গত, বৃহস্পতিবার ভদ্রেশ্বর পুরসভার এক্সিকিউটিভ অফিসারের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন চেয়ারম্যান প্রলয় চক্রবর্তী-সহ মোট আট জন কাউন্সিলর। ভদ্রেশ্বর পুরসভায় মোট ২২টি ওয়ার্ড রয়েছে। গত পুর নির্বাচনে তার মধ্যে ২০টিতেই জয় পেয়েছিল তৃণমূল। একটি আসনে বিজেপি এবং অন্যটিতে নির্দল প্রার্থী জিতলেও পরে তাঁরাও তৃণমূলে যোগ দেন। ফলে কার্যত বিরোধীশূন্য পুরবোর্ডই চলছিল এত দিন। কিন্তু সাম্প্রতিক বিধানসভা নির্বাচনে ছবিটা বদলে যায়। পুরসভার অন্তত ১৪টি ওয়ার্ডে পিছিয়ে পড়ে তৃণমূল।

