তিনি দ্রুতই দেশে ফিরে যাবেন বলে ঘোষণা করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর দলের নেতারা বলছেন, বড়জোর মাস ছয়েক, তারমধ্যে নেত্রী ও দলের বাকিদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত।
যদিও হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টি পুরোপুরি বাংলাদেশ সরকারের উপর নির্ভর করছে। হাসিনার দেশে ফেরার কথা ঘোষণা করা মাত্র বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামির ঘনিষ্ঠ মহল আওয়ামী লিগ নেত্রীর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে শুরু করেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তথা বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, শেখ হাসিনা অবশ্যই দেশে ফিরতে পারবেন। তবে সেটা হবে বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছা এবং নিয়ম মেনে। (Home Minister and BNP leader Salahuddin Ahmed stated that Sheikh Hasina will certainly be able to return to the country; however, this will be in accordance with the wishes and regulations of the Government of Bangladesh)
অন্যদিকে, বিএনপি বিরোধী শিবির, এমনকী ওই দলের প্রাক্তন নেত্রী তথা স্বতন্ত্র সাংসদ রুমিন ফারহানার মতো রাজনীতিকেরা মনে করছেন তারেক রহমানের সরকারে সাহস নেই হাসিনার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার। ব্যরিস্টার ফারহানার মতে, হাসিনা দেশে ফিরে এলে রাজনৈতিক পরিস্থিতির যে পরিবর্তন হবে তা সামাল দেওয়ার ক্ষমতা বিএনপির নেই। আওয়ামী লিগ নেত্রীকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সাহস হবে না বিএনপি সরকারের, মনে করেন দলটির সাবেক এই নেত্রী। (According to Barrister Rumin Farhana, the BNP lacks the capacity to handle the changes in the political landscape that would ensue upon Hasina's return to the country. This former leader of the BNP and Independent member of Parliament believes that the BNP government would not have the audacity to carry out the death sentence against the Awami League chief)
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের বিদেশ বিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হলেও আওয়ামী লিগ ফের ঘুরে দাঁড়াবে এবং আগামী নির্বাচনে দলটি অংশ নেবে বলে তিনি মনে করেন। (Touhid Hossain, the former Foreign Affairs Advisor to Bangladesh's interim government, stated in an interview that he believes the Awami League will bounce back even if its activities are banned, and that the party will participate in the upcoming election)
বাংলাদেশের রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, নিষেধাজ্ঞার কারণে আওয়ামী লিগ মাঠে-ময়দানে সেভাবে দৃশ্যমান না হলেও দলটির দিন দিন জনসমর্থন বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দেশে ফেরার ঘোষণা দেওয়ার পাশাপাশি শেখ হাসিনা তাঁর পাসপোর্ট ফেরত চেয়েছেন যা আগের অন্তর্বর্তী সরকার বাতিল করে দিয়েছে। এই অবস্থায় দেশে ফিরতে ট্রাভেল পাশ প্রয়োজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর, যা দিল্লির বাংলাদেশ দূতাবাস ইস্যু করতে পারে। কিন্তু স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়ে দিয়েছেন, শেখ হাসিনাকে ট্রাভেল পাশ ইস্যু করার প্রশ্ন ওঠে না। বাংলাদেশ সরকার তাঁকে একজন সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসাবে ফেরাতে ভারতের কাছে ফের দাবি জানাবে। (The Home Minister of Bangladesh Mr. Salauddin Ahmed has stated that issuing a travel pass to Sheikh Hasina is out of the question. The Government of Bangladesh will once again request India to repatriate her as a convicted offender)
এমন রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক জটিল পরিস্থিতির মধ্যে হাসিনা দেশে ফেরার ঘোষণার পাশাপাশি দ্য ওয়াল-কে জানিয়েছেন দেশে ফেরার পর তাঁর কর্মসূচি কী হবে। কোন কাজে ঝাঁপাতে চান তিনি। পড়ুন বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সভাপতির পূর্ণাঙ্গ সাক্ষাৎকার।
দ্য ওয়াল: আপনি সম্প্রতি বলেছেন মাথা উঁচু করে দ্রুত দেশে ফিরে যাবেন। আপনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা বিচারাধীন এবং একটি মামলায় দুর্ভাগ্যজনকভাবে আপনার মৃত্যুদণ্ডের সাজা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভারত সরকার যখন আপনাকে ফেরাতে বাংলাদেশ সরকারের আর্জি উপেক্ষা করছে তখন আপনার পক্ষে কীভাবে দেশে ফেরা সম্ভব?
শেখ হাসিনাঃ প্রথমেই একটা কথা পরিষ্কার করা দরকার, যে ট্রাইব্যুনালে বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে সেটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩ অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জন্য গঠন করা হয়েছিলো। ইউনুসের অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার বেআইনী ভাবে চারবার অধ্যাদেশ জারি করে এই আইনে ৩৭টি পরিবর্তন এনে ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচার কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। এই ট্রাইব্যুনালে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বিরোধীদের বিচারক ও প্রসিকিউটর হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
আমার বিরুদ্ধে যে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়া হয়েছে সেটি কোন বিচার নয়, এটি যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের প্রতিশোধ মাত্র। এই ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালে ন্যায় বিচারের কোন মানদন্ড অনুসরন করা হয়নি। আমাকে আইনীভাবে মোকাবেলার সুযোগ দেয়া হয়নি। সাজানো সাক্ষ্য ও প্রমাণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ মিথ্যা অভিযোগে বিচারের নামে প্রহসন করা হয়েছে। এটা করা হয়েছে আমাকে এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক ময়দান থেকে দূরে রাখার জন্য। এই ষড়যন্ত্র ইতোমধ্যেই দেশবাসীর কাছে পরিষ্কার।
আমার বাবা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ১৯৭১ সালের পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি রেখে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সেলের পাশে কবর খুঁড়ে রাখা হয়েছিল। কিন্তু তিনি মাথা নত করেননি। আমি তাঁরই কন্যা। আমার রক্তেও সেই শিক্ষা আছে। আমি ইতিপূর্বে দুইবার মামলা, মৃত্যুর হুমকি, রাষ্ট্রযন্ত্রের জেল-জুলুম নির্যাতনের হুলিয়া মাথায় নিয়ে দেশে ফিরেছি। আমাকে ১৯ বার হত্যা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোন কিছু আমাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। আমি মৃত্যুকে পরোয়া করি না। মৃত্যুর ভয় দেখিয়ে আমাকে থামানো যায় না।
ভারত একটি গণতান্ত্রিক ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তারা তাদের নিজস্ব নিয়ম এবং আন্তর্জাতিক রীতিনীতি অনুসরণ করে সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের সিদ্ধান্ত একান্তই তাদের, এই বিষয়ে আমার বক্তব্য প্রদান সমীচীন হবে না। তবে আমি বলতে পারি আমি কখন, কীভাবে দেশে ফিরব সেই সিদ্ধান্ত একান্তই আমার। আমার শক্তি বাংলাদেশের জনগণ এবং তাঁদের ভালোবাসা। জনগণের শক্তিতে বলীয়ান হয়েই আমি ফিরব। কোন অবৈধ রায় কিংবা কোন রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র আমাকে রুখতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষের জন্য যেকোন ত্যাগ স্বীকারে আমি প্রস্তুত।
দ্য ওয়াল: আপনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় একটি আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন আপনি দেশে ফিরে গিয়ে রাজনীতি থেকে অবসর নিতে চান এবং দলের সভাপতি পদ থেকেও সরে দাঁড়াবেন। এই বিষয়ে আপনার বক্তব্য কী? পুত্র কি মায়ের কথাই বলেছেন?
শেখ হাসিনাঃ জয় যেটা বলেছে ঠিক বলেছে, আমি নিজেও তাই মনে করি। মানুষের জীবনে অবসর একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। আওয়ামী লিগের বিগত দুই জাতীয় কাউন্সিলেও আমি নতুন নেতৃত্বকে দায়িত্ব গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিলাম। তবে বর্তমানে বাংলাদেশের জনগণ যে ভয়াবহ সময়ের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে তাদেরকে ছেড়ে আমি কীভাবে বিশ্রাম নেব? এই দুঃসময়ে দেশের জনগণকে আমি ছেড়ে যেতে পারি না।
বাংলাদেশের জনগণের নিরাপত্তা, তাঁদের উন্নত জীবনমান ও অর্থনৈতিক মুক্তি, গণতন্ত্র ও আইনের শাসন, সকলের সমানাধিকার এবং আওয়ামী লিগের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্ব নির্বাচনের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও আগামী দিনের সাফল্য নিশ্চিত করেই আমি অবসর নেব। সাধারণ মানুষের ভাগ্য নিয়ে দেশবিরোধী কোন গোষ্ঠী যেন ছিনিমিনি খেলতে না পারে আমি সেটা নিশ্চিত করব। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বলীয়ান নীতি-আদর্শভিত্তিক একটি সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মান নিশ্চিত করে তবেই আমি বিশ্রাম নিব।
দ্য ওয়াল: আমি নির্দিষ্ট সূত্র থেকে জেনেছি, যুক্তরাষ্ট্র সহ ইউরোপের কিছু দেশ আওয়ামী লিগের পুনর্বাসনের শর্ত হিসেবে আপনাকে সভাপতির পদ থেকে সরে যেতে পরামর্শ দিয়েছে। শেখ পরিবারের কেউ দলের নেতৃত্বে থাকুক সেটাও তাঁরা চান না বলে শুনেছি। এই ব্যাপারে আপনার অভিমত কী?
শেখ হাসিনাঃ দেখুন জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী ও দুইবার বিরোধীদলীয় নেতা হয়েছি। আমার নিজের চাওয়া পাওয়ার তো আর কিছু নেই। ১৯৮১ সালে আমি আওয়ামী লিগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছিলাম। তারও আগে ১৯৬২ সালে স্কুলে পড়ার সময়ে তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে আমার রাজনৈতিক হাতেখড়ি। তারপর থেকে বাংলাদেশের প্রতিটি স্বাধিকার সংগ্রামে আমি অংশগ্রহণ করেছি। আমার জীবনের প্রায় পুরোটা আমি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নের সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে উৎসর্গ করেছি।
আওয়ামী লিগ একটি গণতান্ত্রিক দল। এই দলের নেতৃত্ব গঠনতন্ত্র অনুযায়ী কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়। আমি নিজেও কাউন্সিলের মাধ্যমেই সভাপতি নির্বাচিত হয়েছি। অতএব নেতৃত্বে কে থাকবে, কে থাকবে না সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার কেবলমাত্র দলীয় কাউন্সিল তথা আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীদের। এই ক্ষেত্রে বাইরের কারও পরামর্শ অপ্রাসঙ্গিক।
আওয়ামী লিগ বাংলাদেশের আপামর জনসাধারনের দল। জন্মলগ্ন থেকে জনগণের ভালোবাসাকে পুঁজি করে এই দল তাঁদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে, তাঁদের মতামতের ভিত্তিতে নেতৃত্ব নির্বাচিত হয়েছে। তাই আওয়ামী লিগের সকল জবাবদিহিতাও কেবলমাত্র দলীয় কর্মী-সমর্থক ও জনগনের কাছে। অন্য কারও প্রেসক্রিপশনে চলা আওয়ামী লিগের নীতিতে নেই।
গণতন্ত্রের অন্যতম মূল স্তম্ভ হচ্ছে স্বাধীনভাবে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার। যারা একই সঙ্গে গণতন্ত্রের কথা বলেন, আবার কোনও দলের নেতৃত্ব নির্ধারণ করে দিতে চান তাঁদের উদ্দেশ্যে বলব, এটা গণতন্ত্র নয়। এটি নতুন ধরনের উপনিবেশবাদ। বাংলাদেশের মানুষ ১৯৭১ সালে রক্ত দিয়ে নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও ভাগ্য নির্ধারণের অধিকার অর্জন করেছে। তারা কোন নতুন উপনিবেশবাদ চায় না। শুধু আওয়ামী লিগ নয়, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীন রাজনীতির কোন বিষয়েই বাইরের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়।
দ্য ওয়াল: আমি বাংলাদেশের নির্বাচন কভার করতে গিয়ে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলে বুঝেছি আওয়ামী লিগের সমর্থন অনেকটাই অটুট। মাঠে সমর্থনের ফসল আছে। কিন্তু সেই ফসল কেটে ঘরে তোলার জন্য তদারক করার লোকের অভাব। অর্থাৎ উপযুক্ত নেতৃত্ব নেই। আপনি কি এই বিষয়টি নিয়ে কিছু ভেবেছেন?
শেখ হাসিনাঃ আওয়ামী লিগ একটি আদর্শভিত্তিক দল। ১৯৪৯ সালে দলটির জন্ম হয়েছিলো এই ভূখণ্ডের মানুষের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে। এই দলের নেতৃত্বে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। আওয়ামী লিগ যখনই ক্ষমতায় গিয়েছে দেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করেছে, দেশের উন্নয়ন করেছে। এদেশের যত অর্জন সবই আওয়ামী লিগের হাত ধরে। শাসন ক্ষমতায় না থাকলেও দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় আওয়ামী লিগ সর্বদা সংগ্রাম জারি রেখেছে। তাই আওয়ামী লিগের প্রতি জনসমর্থন সবসময়ই ছিল।
বাংলাদেশ আজ এক গভীর সংকটকালীন সময় অতিক্রম করছে। দেশের মানুষের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হচ্ছে। গণতন্ত্রকে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়েছে। দেশে মবের রাজত্ব চলছে। আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবস্থা ভয়াবহ, অর্থনীতি ধ্বংসপ্রায়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধ্বংস করা হচ্ছে, সংখ্যালঘুদের স্বাভাবিক জীবনের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করা হয়েছে। এদেশের কোটি কোটি মানুষ এখন তাই আরো দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে আওয়ামী লিগই তাঁদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়।
আমি আগের প্রশ্নের উত্তরে বলেছি, আওয়ামী লিগের নেতৃত্ব দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় কাউন্সিলের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়। যারা বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বে এসেছে তারা সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এসেছে। নেতৃত্ব একটি পবিত্র দায়িত্ব। যারা এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হবে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতেই তাদের সরে যেতে হবে। কর্মীদের আস্থার প্রতিদান দিতে না পারলে নেতৃত্ব মূল্যহীন। যারা দক্ষতার প্রমাণ দেবে, সর্বতোভাবে নেতাকর্মীদের পাশে থাকবে কর্মীরা তাকেই তাঁদের নেতা হিসেবে বেছে নেবে।
আপনাকে বুঝতে হবে, ৫ অগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রযন্ত্রের সকল উপকরণ ব্যবহার করে বাংলাদেশ আওয়ামী লিগের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর নীরব রাজনৈতিক গণহত্যা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক কর্মসূচী তো দূরের কথা তাঁদের স্বাভাবিক জীবন ধারণের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দশ হাজার নেতাকর্মী গুম-খুনের শিকার হয়েছেন। দেড় লক্ষ নেতাকর্মীকে মিথ্যা মামলায় কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এত সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও দেশে আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীরাই সকল দেশবিরোধী চক্রান্তের বিরুদ্ধে সোচ্চার আছে, সাধ্যমতো কর্মসূচী পালন করছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সময়ের প্রয়োজনেই অনেক নতুন নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে। অতএব আওয়ামী লিগের উপযুক্ত নেতৃত্বের অভাব কখনই হবে না।
দ্য ওয়াল: আপনি আমাকে এর আগে সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন আওয়ামী লিগের নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আনবেন। বিশেষ করে জনবিচ্ছিন্ন নেতাদের সরিয়ে পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির একনিষ্ঠ নেতাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসাবেন। সেই কাজটি কি শুরু করতে পেরেছেন? আপনার দলের হয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যাঁরা কথা বলেন বা সংবাদমাধ্যমে দলকে প্রতিনিধিত্ব করেন এমন অনেকের প্রতি আওয়ামী লিগের তৃণমূলের কর্মী সমর্থকদের আস্থা, ভরসা নেই। আছে তীব্র অসন্তোষ, ক্ষোভ, অনাস্থা। আপনি কি এই বিষয়ে অবগত এবং কোন পদক্ষেপ করবেন?
শেখ হাসিনাঃ আওয়ামী লিগের অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক কাঠামো শক্তিশালী বলেই দলের কর্মী সমর্থকরাও তাঁদের ক্ষোভ, অসন্তোষ বা অভিযোগের কথা বলতে পারে। আপনি বাংলাদেশের অন্য কোনও দলের ক্ষেত্রে এটি পাবেন না। আওয়ামী লিগের সকল সদস্য নিজেদের একটি পরিবারের অংশ মনে করে এবং সে কারণে এটির ভাল-মন্দ নিয়ে নিজেরাই কথা বলে।
আওয়ামী লিগ গণমানুষের দল। গণমানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা, তাঁদের ভাষা বুঝতে পারা, তাঁদের ভাষায় কথা বলা এই দলের প্রতিটি নেতাকর্মীর দায়িত্ব। যারা বিভিন্ন পর্যায়ে নেতৃত্বে এসেছে তারা যোগ্যতা দিয়ে, কর্মীদের অভিপ্রায়ে এসেছে। সেটা ধরে রাখা তাঁদের প্রধান দায়িত্ব। এই দায়িত্ব পালনে ব্যর্থদের ব্যাপারে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে দলীয় কাঠামোতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এটি একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া, আওয়ামী লিগ সবসময় সেটি করে এসেছে।
একই সঙ্গে এটিও মনে রাখা জরুরি, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা দলের ভিতরে অন্তঃকোন্দল এবং বিভক্তি তৈরির বিষয়ে সবসময় সচেষ্ট থাকে। প্রতিকূল সময়ে তা আরও বৃদ্ধি পায়। আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, দলীয় নেতৃবৃন্দের প্রত্যেকের অবদান, কর্মীদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ, তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণরুপে অবগত আছি। যারা দলের স্বার্থে, দেশের স্বার্থে সকল প্রতিকূলতা সত্ত্বেও কাজ করে যাচ্ছে দলীয়ভাবে তাদেরকেই মূল্যায়ন করা হবে।
দ্য ওয়াল: দায়মুক্তি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আপনি রাজনৈতিক জনসংযোগের এক অভিনব পন্থা অবলম্বন করেছেন। পাঁচবারের প্রধানমন্ত্রীর, দলের সভাপতির একেবারে ওয়ার্ড, ইউনিয়ন স্তরের নেতাকর্মীর সঙ্গে সেতুবন্ধনের এমন নজির আমি দেখিনি। আপনি এই বিষয়টি কীভাবে উদ্ভাবন করলেন?
শেখ হাসিনাঃ আমি সর্বদাই আমার কর্মীদের পাশে থাকার চেষ্টা করি। ১৯৮১ সালে সব হারনো আমি যখন দেশে ফিরেছিলাম তখন এই কর্মীরাই ছিল আমার স্বজন, আমার আত্মার আত্মীয়। তখনও আমি দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়িয়েছি, কর্মীদের কথা শুনেছি, তাঁদের ঐক্যবদ্ধ করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের সংগ্রাম করেছি। কর্মীদের সঙ্গে এই নিবিড় যোগাযোগ জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান আমাকে শিখিয়েছেন। তিনিও সারাদেশে ঘুরে সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন।
২০২৪ এর ৫ অগস্ট মেটিক্যুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে মহম্মদ ইউনুসের নেতৃত্বে দেশবিরোধী গোষ্ঠী বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা দখল করে। আওয়ামী লিগের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের উপর শুরু হয় অবর্ণনীয় নির্যাতন। পাঁচ থেকে ছয় লাখ মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে। রাষ্ট্রীয় শোষন ও নির্যাতন থেকে রক্ষা রক্ষা পায়নি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মুক্তিযোদ্ধা, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, আইনজীবী, সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক কর্মী, পেশাজীবী, সরকারি-বেসরকারী কর্মকর্তা, সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এমনকি রাজধানী ঢাকার অলিতে গলিতে সৃষ্টি করা হয়েছে ত্রাসের রাজত্ব। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রগতিশীল জনগোষ্ঠীর উপর এমন নির্মম নির্যাতনের নজির বাংলাদেশের ইতিহাসে আর নেই।
এই কাজে রাষ্ট্রযন্ত্রকে সর্বতোভাবে ব্যবহার করেছে ইউনুসের অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার। খোদ ইউনুসই প্রতিনিয়ত মব উস্কে দিয়েছে। একদিকে চালানো হয়েছে জুলুম নির্যাতন অন্যদিকে যারা এই অন্যায়ের সঙ্গে জড়িতে তাদের দেওয়া হয়েছে ইন্ডেমনিটি। বিচারব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছে। নির্যাতিতদের আইনি প্রতিকারের নূন্যতম সুযোগটুকুও কেড়ে নেওয়া হয়েছে। দেশে এক নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিল ইউনুসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার। সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন সরকার গঠিত হলেও এখন পর্যন্ত সেই অন্যায়ের ধারাবাহিকতা চলমান।
এই অসহায় মানুষদের কথা শোনার মতো কেউ ছিল না। দেশের গণমাধ্যমের কন্ঠরোধ করে এইসব অন্যায়কে আড়াল করা হয়েছে। দুঃখজনক হলেও সত্য আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, কিংবা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানসমূহও এই বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। এই নির্যাতিত নিপীড়ত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ানোকে আমি আমার ঐকান্তিক দায়িত্ব বলে মনে করি। তাই দায়মুক্তি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমি তাঁদের কষ্টের কথা শুনছি, তাঁদের অভিযোগের কথা শুনছি এবং সাধ্যমতো তাঁদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছি।
দ্য ওয়াল: আপনি বাংলাদেশের পাঁচ বারের প্রধানমন্ত্রী। প্রায় সাড়ে চার দশক আপনি আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। ছুটে বেড়ানো কর্মব্যস্ত জীবন ছিল আপনার। বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে আপনি কীভাবে মানিয়ে নিয়েছেন? রহস্যটা কী?
শেখ হাসিনাঃ বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত করাই আমার রাজনীতির একমাত্র লক্ষ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই লক্ষ্যে তাঁর জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমিও সেই আদর্শ ধারণ করেই রাজনীতি করি। যখনই সুযোগ পেয়েছি জনগণের কল্যাণে সর্বোচ্চ কাজ করেছি। পাঁচবার প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যথাযথ আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও সুশৃঙ্খল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমরা বাংলাদেশকে একটি সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্থাপন করতে পেরেছিলাম।
২০০৮ সাল পরবর্তী ১৬ বছর টানা চার মেয়াদে সরকারে থাকাকালীন পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, রুপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, মাতারবাড়ি গভীর সমূদ্র বন্দর, কর্নফূলী টানেল, বঙ্গবন্ধু স্যাটালাইটের মতো মেগা প্রজেক্ট আমরা বাস্তবায়ন করেছি। ধারাবাহিকভাবে ৬.৫ থেকে ৭.৫ জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখে ৭০ বিলিয়ন ডলার জিডিপির অর্থনীতিকে আমরা ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করেছি। মানুষের মাথাপিছু আয় ৪৮২ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে হয়েছে ২৭৮৪ মার্কিন ডলার, যা দক্ষিণ এশিয়ার মাঝে সর্বোচ্চ। দেশের দারিদ্র্যের হার ৪১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১৮.৭ শতাংশ এবং অতি দারিদ্র্যের হার ২৫.১ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫.৬ শতাংশ করেছি। আমরা শতভাগ জনগণকে বিদ্যুতায়নের আওতায় এনেছি, দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৭৮২ মেগাওয়াট থেকে ২৮৫৬৩ মেগাওয়াটে উন্নীত করেছি।
আমরা প্রায় ১৪ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে দেশের প্রান্তিক জনগণের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ৩০ ধরনের ওষুধ দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। আমাদের শাসনামলে মাতৃমৃত্যুর হার প্রতি লাখে ৩৭০ জন থেকে ১৮৪ তে নেমে এসেছে, শিশু মৃত্যুর হার নেমে এসেছে ৮৪ জন থেকে ২১ জনে। সুপেয় পানির জল প্রাপ্তি বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৯৮ শতাংশ এবং স্যানিটারি ল্যাট্রিন ব্যবহার হয়েছে ৯৭ শতাংশ। মানুষের গড় আয়ু ৫৯ বছর থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭৩। আমরা ৮ লাখ ৪৫ হাজার ভূমিহীন পরিবারকে দু কাঠা জমি, আধাপাকা ঘর এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করে দিয়েছি। এতে মাথা গোঁজার ঠাই পেয়েছে অন্তত ৪৫ লক্ষ মানুষ। আরও ২২ হাজার ঘর নির্মাণাধীন ছিল। সেগুলো হস্তান্তর করে আমরা দেশকে অতি দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হিসেবে ঘোষণা করতাম। কিন্তু সে সুযোগ পেলাম না। ১৪৫ ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচীর আওতায় প্রায় দুই কোটি মানুষকে বিভিন্ন ধরনের ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করেছি। একই সঙ্গে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে তা দমন করেছিলাম। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর আধুনিকায়ন করে একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম যেখানে জনগণ নির্ভয়ে জীবন কাটাতো। অর্থাৎ দেশের মানুষের জীবন মান উন্নয়নের জন্য সম্ভাব্য সকল কিছু আওয়ামী লিগ সরকার করেছে।
কিন্তু ষড়যন্ত্রমূলক ভাবে আওয়ামী লিগ সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশকে উল্টোপথে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। নানাবিধ সংকটে জনগণের জীবনে আজ নাভিশ্বাস উঠছে। দেশে আজ আইনের শাসন নেই। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নেই। মত প্রকাশের স্বাধীনতা নেই। তারা মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। দেশে জঙ্গীবাদের উত্থান ঘটছে। শীর্ষ সন্ত্রাসীরা ছাড়া পেয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে আমি এক মুহুর্তও বসে থাকতে পারিনি। দেশের মানুষকে এই অসহায় অবস্থা থেকে মুক্ত করার জন্য আমাকে নতুন করে সংগ্রাম করতে হচ্ছে। তাই কর্মব্যস্থতা আসলে কমেনি, বরং বেড়েছে।
শারীরিকভাবে হয়তো আমি দেশে নেই, কিন্তু আমার চিন্তা চেতনা ও আবেগের সবটুকু জুরে রয়েছে আমার দেশের জনগণ। তাঁদের এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি দিতে আমি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছি। আমার দলের নেতাকর্মীরা কাজ করে যাচ্ছে। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, সম্ভাব্য সকল আইনি কাঠামোতে এবং কূটনৈতিক ভাবেও আমাদের কাজ চলমান।
দেশের মানুষজন এখন বুঝতে পারছে কীভাবে তাদের বিভ্রান্ত করা হয়েছে, কীভাবে একটি দেশবিরোধী গোষ্ঠী নিজস্ব স্বার্থে ষড়যন্ত্রমূলক আন্দোলনের মাধ্যমে রাষ্ট্র বেদখল করেছে। মানুষ বুঝতে পেরেছে আওয়ামী লিগই তাদের একমাত্র নিরাপদ আশ্রয়। আমি যখন প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষদের সঙ্গে কথা বলি তখন বুঝতে পারি কি অধীর আগ্রহে তারা অপেক্ষা করছে আমার ফিরে যাওয়ার। আমি বুঝতে পারি আমার প্রতি তাদের অনিঃশেষ ভালোবাসা। জনগণের এই ভালোবাসাই সকল পরিস্থিতিতে আমার মানিয়ে নেয়ার মূল রহস্য।
দ্য ওয়াল: আপনার রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে প্রাণনাশের চেষ্টা এবং প্রত্যাবর্তন দুটি শব্দই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আপনার আগের দুটি প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে আগামী প্রত্যাবর্তনের মৌলিক ফারাক কী হবে?
শেখ হাসিনাঃ আপনি ঠিকই বলেছেন। প্রাণনাশের চেষ্টা এবং প্রত্যাবর্তন আমার জীবনের সঙ্গে অতোপ্রতোভাবে জড়িয়ে আছে। আমাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু আমার নেতাকর্মীদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের ভালোবাসা আমাকে বারবার শত্রুর বুলেট, গ্রেনেড ও বোমা হামলা থেকে রক্ষা করেছে। ৫ অগস্টেও আমাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল, আমিই ছিলাম মূল টার্গেট। কেননা আমাকে হত্যা করতে পারলে দেশবিরোধী চক্র তাদের সকল ষড়যন্ত্র সহজে বাস্তবায়ন করতে পারতো। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা যেহেতু বাঁচিয়ে রেখেছেন, আমি আবারও জনগনকে সঙ্গে দেশকে সংকট থেকে উদ্ধার করব ও গণতন্ত্র পুনুরুদ্ধার করব।
১৯৮১ সালে সামরিক শাসকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আমি প্রথমবার ফিরে এসেছিলাম। তখন আমি ছিলাম পরিবার পরিজনহারা এক নারী। কিন্তু আমাকে বরণ করে নিতে এসেছিল লক্ষ লক্ষ জনতা। আমাকে তারা তাদের বোন হিসেবে, মেয়ে হিসেবে বরণ করে নিয়েছিল। সে প্রত্যাবর্তন ছিল পিতার স্বপ্নপূরনের শপথ নেওয়া এক কন্যার প্রত্যাবর্তন। ২০০৭ সালে আমি ফিরে এসেছিলাম জরুরি অবস্থার সময়, সেনা সমর্থিত সরকারের নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে। সেটিও ছিলো সংগ্রামের প্রত্যাবর্তন।
এবারের প্রত্যাবর্তন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন, চ্যালেঞ্জ ভিন্ন, দায়িত্বও ভিন্ন। ১৯৮১ সালে আমি ফিরেছিলাম একটি দলকে পুনর্গঠন করতে, ২০০৭ সালে ফিরেছিলাম গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে। এবার আমাকে ফিরতে হবে একটি দেশকে পুনর্গঠনের জন্য। কেননা অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার এবং সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকার দেশের প্রতিটা সেক্টর ধ্বংস করেছে। প্রতি মূহুর্তে তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ভুলন্ঠিত করছে, দেশের আবহমান সংস্কৃতিকে ধ্বংস করছে, জাতিকে বিভক্ত করছে।
আমি বাংলাদেশকে যে শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়েছিলাম, দলমত নির্বিশেষে সকলের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটিয়েছিলাম, বাংলাদেশকে বিশ্বের বুকে একটি সম্মাজনক অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলাম, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে সেটি ধ্বংস করা হয়েছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে আছে। দেশকে কূটনৈতিক ভাবে একঘরে করে ফেলা হচ্ছে। দেশকে রক্ষার করার জন্যই আমাকে ফিরতে হবে।
আর একটি পার্থক্য হচ্ছে, ১৯৮১ সালে আমি ফিরেছিলাম একজন শোকার্ত মেয়ে হিসেবে। কিন্তু এবার ফিরব একজন অভিজ্ঞ রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে। আমি জানি দেশের মানুষ কী চায়, আমি জানি কীভাবে তাদের সেই চাওয়া পূরণ করতে হয়। আমি জানি কীভাবে সীমিত সামার্থ্য নিয়েও একে পর এক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হয়, কীভাবে দেশকে জঙ্গি ও সন্ত্রাসমুক্ত করতে হয়, কীভাবে রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা জনগণের দোড় গোড়ায় পৌঁছে দিতে হয়। অতএব দেশ পূনর্গঠনের লক্ষ্যে আমার এবারের প্রত্যাবর্তন পরবর্তী যাত্রা কঠিন হলেও জনগনকে সঙ্গে নিয়ে আমি সেটা বাস্তবায়ন করতে পারব। দেশের জনগণও সেটি বিশ্বাস করে।
দ্য ওয়াল: আপনি ১৭ মে'র (১৯৮১-তে এই দিনে ভারত থেকে দেশে ফিরে গিয়েছিলেন) অনুষ্ঠানে বলেছেন, আপনি বাংলাদেশের মানুষকে শোষণ, নিপীড়ন নির্যাতন থেকে মুক্তি দিতে দেশে ফিরতে চান। তারেক রহমানের সরকারের বিরুদ্ধে আপনার প্রধান অভিযোগ গুলি কী?
শেখ হাসিনাঃ সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার ইউনুসের অন্তর্বর্তী সরকারেরই ধারাবাহিকতা। বিগত সাড়ে তিনমাসের কর্মকান্ডে এটি প্রমাণিত। শুধু মুখ বদলেছে কিন্তু কোন নীতির পরিবর্তন হয়নি। অর্থনৈতিক লুটপাট, বেহাল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দেশবিরোধী চুক্তি ও কার্যক্রম, বিরোধী দল দমন, সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণ, উগ্রপন্থার বিস্তার ও সন্ত্রাসবাদের প্রশ্রয়, মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা; সবই আগের মতোই চলমান রয়েছে।
দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল আওয়ামী লিগকে নির্বাচনের বাইরে রেখে গণতন্ত্র হত্যার মধ্য দিয়ে এই সরকারের জন্ম। দেশের জনগণের প্রতি এদের ন্যূনতম কমিটমেন্ট কিংবা সংশ্লিষ্টতা নেই। যুদ্ধাপরাধের দায়ে দণ্ডিত রাজাকার, জঙ্গিবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা আজ সংসদে। সাজানো সংসদের প্রথম অধিবেশনে ক্ষমতার ভাগ বাটোয়ারা নিয়ে অনেক আলোচনা হলেও দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোন বিষয়ে আলোচনা হয়নি।
প্রতিদিন দেশে হামে নিরীহ শিশুরা মারা যাচ্ছে। বর্তমান সরকার এই সংকট মোকাবেলায় কোন কার্যকর পদক্ষেপই নেয়নি। অসহায় অভিভাবকরা সন্তানের যথাযথ চিকিৎসাটুকু পাচ্ছে না। ধর্ষণ আর নারী নির্যাতন মহামারী আকারে রুপ নিয়েছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘটছে নৃশংস ধর্ষণ আর হত্যাকান্ড। দেশের নদীগুলিতে আজ মাছের বদলে পাওয়া যাচ্ছে ক্ষতবিক্ষত লাশ। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চূড়ান্ত অবনতির কারণে মানুষ আজ ঘরেও নিরাপদ না। সারাদেশে দেখা যাচ্ছে সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি। বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীদের চাঁদাবাজি ও দখলবাণিজ্যে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।
জ্বালানী সংকটে একের পর এক কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে। বেকার হচ্ছে লাখো মানুষ। সেচ ও সারের সংকটে কৃষকরা আজ অসহায়। একদিকে মানুষের আয় কমছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফিতির কারণে বাড়ছে জিনিসপত্রের দাম। অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার কারণে দেশের ভবিষ্যত আজ বিপর্যস্ত। বিদেশি বিনিয়োগ নেমে আসছে শূন্যের কোটায়। সারাদেশে এক নৈরাজ্যমূলক পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে চূড়ান্ত ব্যর্থ। আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর একমাত্র কাজ হলো আওয়ামী লিগের উপর দমন পীড়ন চালানো। প্রতিদিন গ্রেফতার করা হচ্ছে আওয়ামী লিগের নেতাকর্মীদের। চালানো হচ্ছে মব সন্ত্রাস। বিচারব্যবস্থার উপর চলছে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ। এখনও বিনা বিচারে কারাগারে আটক রয়েছে হাজারো আওয়ামী লিগের নেতাকর্মী, আটক আছে সাংবাদিক, শিল্পী, বুদ্ধিজীবীরা। অন্তর্বর্তী সরকারের দূর্নীতির তদন্ত চেয়ে করা আবেদন সরাসরি খারিজ করা দেওয়া হচ্ছে উচ্চ আদালত থেকে। অর্থাৎ বর্তমান সরকার ইউনুস আমলের সকল অপকর্মের ধারাবাহিকতা রক্ষ করে যাচ্ছে। সরকার কাঠামোর পরিবর্তন হলেও দেশ কিংবা জনগণের ভাগ্যের কোন ন্যূনতম পরিবর্তন হয়নি।
দ্য ওয়াল: তিস্তা মহা সেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের ভার আপনি ভারতকে দিয়েছিলেন। তারেক রহমানের সরকার সেটা চিনকে দিচ্ছে। পাকিস্তান ও চিনের সঙ্গে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের ক্রমবর্ধমান সামরিক বোঝাপড়া নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন। ভারতের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে চিন ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ানোর নজির স্পষ্ট। বাংলাদেশের পাঁচবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং আওয়ামী লিগের সভানেত্রী হিসেবে আপনি তারেক রহমানের সরকারের কার্যক্রমকে কীভাবে দেখছেন?
শেখ হাসিনাঃ আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূলভিত্তি হলো সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এই মূলনীতি আমাদের দিয়ে গিয়েছেন। আমি সবসময় এই নীতি অনুসরন করেছি। পররাষ্ট্রনীতি সংক্রান্ত সকল সিদ্ধান্ত এবং বৈদিশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে আমি সর্বাগ্রে দেশের স্বার্থ প্রাধান্য দিয়েছি, দেশের জনগণের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিতের চেষ্টা করেছি। আমি কখনও কোনও গোপনীয় চুক্তি কিংবা দেশের স্বার্থবিরোধী মুচলেকা দেইনি।
১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসেই আমি গঙ্গা ঐতিহাসিক পানিচুক্তি করেছিলাম। আন্তর্জাতিক আদালতে আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে আওয়ামী লিগ সরকার ২০১২ সালে মায়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমূদ্রসীমা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করে বাংলাদেশের আয়তনের প্রায় সমান পরিমাণ সমূদ্রসীমার উপর বাংলাদেশের অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। ভারতের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে ২০১৫ সালে ল্যান্ড বর্ডার এগ্রিমেন্ট স্বাক্ষরের মাধ্যমে আমরা দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত ছিটমহল সমস্যার সমাধান করেছিলাম।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও আমরা বিশ্বের সকল বন্ধুপ্রতীম দেশের সঙ্গে সমমর্যাদা ও পারস্পরিক সুবিধা পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। সকলের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার ফলে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হয়েছে, বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্রসমূহ আমাদের উন্নতিতে সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করেছে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও একটি স্থিতিশীল পররাষ্ট্র নীতির নিরপেক্ষ দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃত হয়েছে। আমি বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে কখনও কোন বিদেশি শক্তি কিংবা রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য পূরণের হাতিয়ার হতে দেইনি।
ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশে সম্পর্ক ঐতিহাসিক। প্রতিবেশী এই দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক উভয় দেশের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। এতে উভয় দেশের জনগণের কল্যাণ হয়। সার্বিক দিক বিবেচনা করে দেশের সর্বোচ্চ স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখেই তিস্তার মহাসেচ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ভারতের সাঙ্গে চুক্তি করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ৫ অগস্ট পরবর্তী সময় থেকে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশে ভারত বিরোধী ন্যারেটিভের প্রচারণা শুরু হয়েছে, যা এখনও চলমান।
অবৈধ ইউনুস এবং বর্তমান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি জনগণকে অন্ধকারে রেখে, খুবই গোপনীয়তার সঙ্গে বিভিন্ন দেশের সাথে চুক্তি করা হচ্ছে। তাদের উদ্দেশ্য যদি সৎ হয়ে থাকে তাহলে কেন এই গোপনীয়তা? জনগণকে জানাতে সমস্যা কোথায়? দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো কেন বিদেশিদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে? কেন দেশের অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাদের অন্য রাষ্ট্রের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকতে হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর উত্তর জানার অধিকার জনগণের আছে। একটি যথাযথ গণতান্ত্রিক সরকার কখনও জনগণকে পাশ কাটিয়ে কোন সিদ্ধান্ত নেয় না। ইউনুস এবং তারেক রহমানের সরকারের কার্যক্রম থেকে এটি প্রতীয়মান তারা দেশের স্বার্থে নয় বরং ব্যক্তিস্বার্থে বিভিন্ন দেশবিরোধী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে।
দ্য ওয়াল: আপনি দেশে ফিরে যাবেন এই শুভ কামনা জানিয়ে শেষ প্রশ্ন হল, স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর আপনার কর্মসূচি কী হবে? কোন কাজগুলিকে আপনি অগ্রাধিকার দেবেন?
শেখ হাসিনাঃ আমার সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল লক্ষ্য হচ্ছে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। সাধারণ মানুষের জীবনে শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। জনগণের মৌলিক অধিকার অর্থাৎ অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা। প্রত্যাবর্তনের পর আমি জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে এসকল লক্ষ্য অর্জনে সংগ্রাম করে যাব।
গণতন্ত্র পুনুরুদ্ধারের জন্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের দাবিতে আমাদের সংগ্রাম চলমান থাকবে। এই দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কোন শক্তিই আমাকে লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করতে পারবে না। দেশের বেশিরভাগ মানুষ আওয়ামী লিগকে রাষ্ট্রক্ষমতায় দেখতে চায়। কেননা আওয়ামী লিগ তাদের একমাত্র আশ্রয় ও ভরসার জায়গা। সুষ্ঠ নির্বাচন হলে আওয়ামী লিগ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করবে।
বর্তমানে বাংলাদেশ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশবিরোধী শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দেশের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে ধ্বংস করেছে। উন্নয়নের সোপান বেয়ে উপরে উঠতে থাকা একটি দেশের অগ্রযাত্রা শুধু থামিয়েই দেওয়া হয়নি বরং পশ্চাদপদ করা হয়েছে। এ থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে আমাদের আশুকরনীয়, স্বল্প মেয়াদী, মধ্যমেয়াদী ও দীর্ঘমেয়াদী কর্মসূচী হাতে নিতে হবে। আমি ইতোমধ্যেই এই বিষয়ে বিস্তারিত পরিকল্পনা শুরু করেছি।
জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসে জরুরি ভিত্তিতে দেশে আইনের শাসন ফিরিয়ে আনা হবে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হারানো আস্থা ফিরিয়ে এনে দেশের জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান হবে। সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করে তাদের দমন করা হবে। যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় সকল অন্যায় এবং দেশবিরোধী চক্রান্তের বিচার নিশ্চিত করা হবে। ক্ষতিগ্রস্থদের আইনি সুরক্ষা এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা হবে।
অর্থনীতিকে ঢেলে সাজিয়ে গণমুখী করা হবে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। ব্যবসায়ীদের মাঝে আস্থা ফিরিয়ে এনে বন্ধ হয়ে যাওয়া সকল কলকারখানা চালুর করা হবে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচী জোরদার করে দেশের প্রান্তিক মানুষদের কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষের দুঃখ লাঘব করা হবে। শিক্ষা এবং স্বাস্থ্যখাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা হবে। কৃষিখাতের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশকে খাদ্য স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হবে। সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ঘটানো হবে। সমতা এবং আত্মমর্যাদার উপর ভিত্তি করে পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করা হবে।
সর্বতোভাবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি সত্যিকারের অন্তর্ভূক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠন করা হবে। যেখানে জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকলে সমানাধিকার ও সম-মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে পারবে।
আমি জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের মেয়ে। জাতি পিতা আমৃত্যু এই দেশের মানুষের জন্য সংগ্রাম করে গিয়েছেন। এই দেশের জন্য আমার বাবা মা ভাই রক্ত দিয়েছে। আমি সেই রক্তের উত্তরাধিকার। জাতির পিতার স্বপ্নই আমার স্বপ্ন। ক্ষুধা দারিদ্র্যমূক্ত সুখী সমৃদ্ধ অন্তর্ভূক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার সেই স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে আমি দেশে ফিরব। জণগণকে সাথে নিয়ে এই লক্ষ্য আমি বাস্তবায়ন করবোই। ইনশাআল্লাহ।

