দ্য ওয়াল ব্যুরো: সীমান্ত পেরিয়ে এ রাজ্যেও থাবা বসিয়েছে পাকিস্তানের কুখ্যাত গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই (Pakistan ISI)। এক গোপন ও নিখুঁত অপারেশনের মাধ্যমে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার পিংলা এলাকা থেকে দুই বিপজ্জনক পাক চরকে হাতেনাতে গ্রেফতার করল রাজ্য পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বা এসটিএফ (STF)।
ধৃতদের নাম গৌতম খাড়া এবং শেখ মুরসালিন। পুলিশের দাবি, ধৃত এই দুই ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে ভারতের মাটিকে ব্যবহার করে পাকিস্তানের গুপ্তচরদের কাছে দেশের অভ্যন্তরীণ ও সামরিক গোপন তথ্য পাচার করার এক বিপজ্জনক চক্র চালাচ্ছিল। তদন্তকারী সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃতদের মধ্যে গৌতম খাড়া পেশায় একজন মোবাইল ফোনের সিম কার্ড বিক্রেতা। পিংলা এলাকায় তাঁর একটি সিমের দোকান রয়েছে। আর এই ব্যবসার আড়ালেই সে দেশের সুরক্ষার সঙ্গে ছিনিমিনি খেলছিল।
গৌতম মূলত সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে 'প্রি-অ্যাক্টিভেটেড' বা আগে থেকেই চালু করে রাখা সিম কার্ড এবং সচল মোবাইল নম্বর সরবরাহ করত শেখ মুরসালিনকে। আর মুরসালিনের কাজ ছিল সেই সমস্ত ভারতীয় সিম কার্ড ও নম্বরগুলি বিভিন্ন গোপন মাধ্যমে সরাসরি পাকিস্তানের আইএসআই হ্যান্ডলার বা সে দেশের গুপ্তচরদের হাতে পৌঁছে দেওয়া।
এই চক্রের কাজ করার পদ্ধতিটি ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ এবং একই সঙ্গে মারাত্মক। কোনও সাধারণ ক্রেতা বা গ্রাহক যখন নতুন সিম কার্ড তোলার জন্য গৌতমের মোবাইলের দোকানে নিজের আসল পরিচয়পত্র ও জরুরি নথিপত্র জমা দিতেন, গৌতম সেই সরল বিশ্বাসের সুযোগ নিত। গ্রাহকের অজান্তেই তাঁর সেই নথি ব্যবহার করে জালিয়াতির মাধ্যমে আরেকটি অতিরিক্ত সিম কার্ড তুলে নিত সে। এই জালিয়াতি করে তোলা ভারতীয় সিম কার্ডের সমস্ত গোপন তথ্য এবং নম্বর পাকিস্তানি চরের কাছে পাঠিয়ে দিত গৌতম।
এরপর সেই সচল ভারতীয় নম্বরগুলি ব্যবহার করে সুদূর পাকিস্তানে বসেই নতুন নতুন হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্ট বা অন্যান্য সোশ্যাল মিডিয়া প্রোফাইল খোলা হত। যেহেতু নম্বরগুলি ভারতীয়, তাই দেশের ভিতর কারোর সন্দেহ হত না। আর এই ডিজিটাল মাধ্যমকে হাতিয়ার করেই ভারতীয় সুরক্ষাবলয়কে ফাঁকি দিয়ে এ দেশের নানা অভ্যন্তরীণ ও স্পর্শকাতর তথ্য সীমান্তে ওপারে পাচার হয়ে যেত।
নথি জালিয়াতি করে এই আন্তর্জাতিক চরবৃত্তি ও দেশবিরোধী কারবারের গন্ধ পেয়ে অনেকদিন ধরেই জাল পেতেছিলেন এসটিএফের গোয়েন্দারা। অবশেষে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ হাতে আসতেই হানা দিয়ে পিংলা থেকে দু'জনকে পাকড়াও করা হয়। আদালতের নির্দেশে আপাতত ধৃত দু'জনকেই কড়া পুলিশি বা জেল হেফাজতে রাখা হয়েছে। এই চক্রের শিকড় ঠিক কতদূর বিস্তৃত এবং এর সঙ্গে জেলার বা রাজ্যের আর কোন কোন রাঘববোয়াল বা প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত রয়েছে, সে বিষয়ে জানতে ধৃতদের দফায় দফায় জেরা করছেন তদন্তকারীরা।
এসটিএফের পদস্থ আধিকারিকদের অনুমান, এই চক্রের জাল শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, তা দেশের অন্য প্রান্তেও গভীরে বিস্তৃত। ধৃতদের ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ এখন জানার চেষ্টা করছে, এই জাল সিম কার্ড ও হোয়াটসঅ্যাপ অ্যাকাউন্টগুলি ব্যবহার করে ভারতের কোন কোন স্পর্শকাতর এলাকা বা সামরিক গোপনীয়তার তথ্য পাকিস্তানের হ্যান্ডলারদের কাছে ইতিমধ্যে পাচার করে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া, এই ভয়ঙ্কর দেশবিরোধী চক্রে ভিনরাজ্যের কোনও যোগসূত্র কিংবা এই জেলার অন্য কোনও মোবাইল সিম বিক্রেতা জড়িয়ে আছে কি না, তা-ও অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই গ্রেফতারির পর সীমান্ত জেলাগুলিতেও পুলিশি নজরদারি এক ধাক্কায় অনেকটাই বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

