দ্য ওয়াল ব্যুরো: অযোধ্যার রাম মন্দিরে অনুদান বিতর্কে (Ram Mandir donation theft case) তদন্তকারী দল বা সিট যে প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করেছে। জানা গিয়েছে, সেখানে মূল অভিযুক্ত বা 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে অবিনাশ শুক্লাকে (Ram Mandir donation theft main accused Avinash Shukla)।
তদন্তকারী সূত্রে (Ayodhya Ram Temple SIT probe) খবর, মন্দিরের গর্ভগৃহে বা দানপাত্রে পড়া টাকা গোনার দায়িত্বে থাকা এই অবিনাশকে কেন্দ্র করেই চলত গোটা চক্রটি। ৪০ দিন ধরে প্রায় ৭০ বার নিখুঁত পরিকল্পনা করে দান করা টাকা ও গয়না সরিয়েছে সে।
তিন সদস্যের এই বিশেষ তদন্তকারী দল সম্প্রতি একটি ৯ পাতার অন্তর্বর্তীকালীন রিপোর্ট জমা দিয়েছে। গত ২৩ জুন উত্তরপ্রদেশের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব (স্বরাষ্ট্র) সঞ্জয় প্রসাদের কাছে এই রিপোর্ট পাঠানো হয়েছিল। সোমবার শ্রী রাম জন্মভূমি তীর্থক্ষেত্র ট্রাস্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এই রিপোর্টের প্রতিটি তথ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ৩০ বছর বয়সি অবিনাশ শুক্লাই যে এই গোটা অপারেশনটির মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল, তা সিটের এই প্রাথমিক রিপোর্টে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তকারীদের দাবি, মন্দিরে ভক্তদের নগদ দক্ষিণা গোনার কাজের জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল অবিনাশকে। আর সেই সুযোগের অপব্যবহার করেই সে টাকা সরাত। অবিনাশের বিরুদ্ধে পাকাপোক্ত তথ্য-প্রমাণ মেলার পরেই তাকে এই মামলার 'এক নম্বর আসামী' হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। অবিনাশের সূত্র ধরেই তদন্তকারীরা এই চক্রে জড়িত আরও পাঁচজনের হদিশ পেয়েছেন এবং মন্দিরের টাকা গোনার ঘরের (counting room) ভেতরে ঠিক কীভাবে এই বিপুল পরিমাণ টাকা চুরি করা হত, তার পুরো ছক ধরে ফেলেছেন।
তদন্তকারী সূত্রের খবর, টাকা গোনার ঘরের সিসিটিভি ফুটেজ বারবার খতিয়ে দেখে দেখা গেছে, অবিনাশ একাধিকবার টাকা গোনার সময় নোটের বান্ডিল এবং খুচরো টাকা সরিয়ে নিজের জামা-কাপড়ে বা অন্য কোথাও লুকিয়ে ফেলছে। এই ফুটেজকে হাতিয়ার করেই পুলিশ চুরির টাকার গতিবিধি ট্র্যাক করেছে এবং বাকি অভিযুক্তদের ভূমিকা স্পষ্ট করেছে। সিটের রিপোর্টে বলা হয়েছে - সিসিটিভি ফুটেজ, বাজেয়াপ্ত করা জিনিসপত্রের তালিকা, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের লেনদেন এবং সাক্ষীদের বয়ান এই সবকটি দিক মেলালে অবিনাশের অপরাধ নিয়ে কোনও সন্দেহের অবকাশ থাকে না।
ফুটেজে আরও দেখা গেছে যে, অবিনাশকে এই চুরির টাকা লুকাতে এবং ঘর থেকে বাইরে পাচার করতে সরাসরি সাহায্য করত অনুকূল মিশ্র, লবকুশ মিশ্র এবং করুণেশ পাণ্ডে। অন্যদিকে মণীশ কুমার যাদব নামের আরেক অভিযুক্ত টাকা গোনার ঘরের ভেতর থেকে গোটা বিষয়টিতে অবিনাশের সঙ্গে কো-অর্ডিনেশন বজায় রাখত। এর বাইরে, মন্দির ট্রাস্টের প্রতিনিধিদের দেওয়া একটি আলাদা সিসিটিভি ফুটেজে রামা শঙ্কর মিশ্র নামের এক ব্যক্তিকে ক্যাশ বা নোটের বান্ডিল সরাতে এবং লুকাতে দেখা গেছে। এখনও পর্যন্ত যে সমস্ত তথ্য-প্রমাণ হাতে এসেছে, তার ভিত্তিতে সিট নিশ্চিত যে এই ছয় অভিযুক্তেরই প্রাথমিক অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে।
তবে তদন্তের জাল শুধু সিসিটিভি ফুটেজেই আটকে ছিল না। অযোধ্যা পুলিশ এই চক্রের সন্ধানে দফায় দফায় তল্লাশি চালায়। অবিনাশ শুক্লার হেফাজত থেকে পুলিশ নগদ ২০ লক্ষ ৩৯ হাজার টাকা, ১,১২১ মার্কিন ডলার, বিপুল পরিমাণ সোনা ও রূপোর গয়না, অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী এবং একটি দামি এসইউভি গাড়ি উদ্ধার করেছে। এই মামলায় ধৃতদের মধ্যে অবিনাশের কাছ থেকেই সবচেয়ে বেশি পরিমাণ সম্পদ উদ্ধার হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, অবিনাশের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খতিয়ে দেখে চক্ষু চড়কগাছ তদন্তকারীদের। তার নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে এমন বিপুল অঙ্কের টাকা জমা পড়েছে এবং লেনদেন হয়েছে, যা তার বৈধ আয়ের সঙ্গে কোনওভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সিটের রিপোর্টে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরা হয়েছে - ট্রাস্টের তরফে মন্দিরের দান গোনার জন্য যে সমস্ত কর্মী চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করা হয়, সমস্ত রকম সরকারি কাটাছেঁড়ার পর তারা মাসে হাতে পান মেরেকেটে ১৫ হাজার টাকার কিছু বেশি। সেখানে গ্রেফতার হওয়ার আগে অবিনাশের ব্যাঙ্কিং লেনদেনের পরিমাণ ছিল আকাশছোঁয়া।
অবিনাশের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ আরও একটি আপত্তিকর জিনিস উদ্ধার করেছে। তার ঘর থেকে একটি চুরির দানবাক্স পাওয়া গেছে, যার গায়ে লেখা ছিল 'রামরাজ্য কোষ' এবং সেটিতে একটি সক্রিয় কিউআর (QR) কোডও লাগানো ছিল। পুলিশ বর্তমানে প্রতাপগড় জেলায় অবিনাশের পৈতৃক ভিটেতেও তল্লাশি চালাচ্ছে এবং সেখানে তার নামে বা বেনামে থাকা সম্পত্তির পরিমাপ করছে। গত কয়েক বছরে সে ঠিক কত টাকার ক্যাশ লেনদেন করেছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাম মন্দিরের দান চুরির এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসার পর দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। এই মামলায় এখনও পর্যন্ত অবিনাশ শুক্লা, অনুকূল মিশ্র, লবকুশ মিশ্র, মণীশ কুমার যাদব, করুণেশ পাণ্ডে, রামা শঙ্কর মিশ্র, সুভাষ শ্রীবাস্তব এবং রামা শঙ্কর ওরফে তিন্নুকে মিলিয়ে মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।
সোমবার স্থানীয় একটি আদালত অনুকূল মিশ্র, লবকুশ মিশ্র এবং করুণেশ পাণ্ডেকে একদিনের পুলিশ রিমান্ডের নির্দেশ দিয়েছে। তদন্তকারীরা আদালতে জানান, এর আগে হেফাজতে নেওয়া পাঁচ অভিযুক্তকে জেরা করে বেশ কিছু নতুন তথ্য ও প্রমাণ হাতে এসেছে, যা যাচাই করার জন্য এই তিনজনকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করা প্রয়োজন। পুলিশ জানিয়েছে, ধৃত সুভাষ শ্রীবাস্তব ছাড়া বাকিদের কাছ থেকে এখনও পর্যন্ত মোট ৭৯ লক্ষ টাকারও বেশি নগদ ও সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সুভাষকে এই গোটা ষড়যন্ত্রের অন্যতম প্রধান অংশীদার বলেই মনে করছে সিট।
উত্তরপ্রদেশ সরকার এই স্পর্শকাতর মামলার তদন্তে যে তিন সদস্যের সিট (SIT) গঠন করেছিল, তাদের পরিধি এখন মূল এফআইআর (FIR)-এর চেয়েও অনেক দূর গড়িয়েছে। রাম মন্দির ট্রাস্টের গত ৫ বছরের সমস্ত আয়-ব্যয়ের অ্যাকাউন্ট পুনরায় অডিট (Re-audit) করার নির্দেশ দিয়েছে এই তদন্তকারী দল। একই সঙ্গে গত ২ বছরে মন্দিরের বড় বড় অনুষ্ঠানগুলিতে ঠিক কত টাকা খরচ করা হয়েছে, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
টাকা চুরির এই ঘটনা খতিয়ে দেখতে গিয়ে মন্দিরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং টাকা পরিচালন পদ্ধতির একাধিক ফাঁকফোকর ও গাফিলতি সিটের রিপোর্টে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রিপোর্টে জানানো হয়েছে:
দান গোনার এই পুরো প্রক্রিয়াটি তদারকি করার দায়িত্বে কোন কোন আধিকারিক ছিলেন এবং তাদের তরফ থেকে কোনও কর্তব্যে গাফিলতি ছিল কি না, তা এখন খতিয়ে দেখছে সিট।

