দ্য ওয়াল ব্যুরো: আগামী শনিবার ব্রিগেড ময়দানে নতুন সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান। কিন্তু সেই মাহেন্দ্রক্ষণের ঠিক আগেই বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের রাস্তায় রক্ত ঝরেছে। দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেছেন শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথ (Chandranath Rath)। খুনের ধরন দেখে তদন্তকারীদের প্রাথমিক অনুমান, এটি অত্যন্ত সুপরিকল্পিত এবং পেশাদার ঘাতকদের কাজ।
তাদের শনাক্ত করতে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই ঘটনাস্থলে অভিযানে নেমেছেন সিআইডি-র উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। রাজ্য পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে একটি বিশেষ তদন্তকারী দল বা 'সিট' গঠন করা হয়েছে।
ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বুধবার রাতে নিজের গাড়িতে করে ফ্ল্যাটে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথবাবু। সেই সময় আচমকাই তাঁর গাড়ির সামনে অন্য একটি গাড়ি এসে গতিরোধ করে দাঁড়ায়। গাড়িটি থামতেই মুহূর্তের মধ্যে বাইকে চড়ে হাজির হয় দুই দুষ্কৃতী। কিছু বুঝে ওঠার আগেই খুব কাছ থেকে তাঁকে লক্ষ্য করে পর পর গুলি চালানো হয়। রক্তাক্ত অবস্থায় রাস্তাতেই লুটিয়ে পড়েন তিনি। তড়িঘড়ি তাঁকে উদ্ধার করে মধ্যমগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত বলে ঘোষণা করেন। আততায়ীরা যে চন্দ্রনাথের গতিবিধি সম্পর্কে আগে থেকেই ওয়াকিবহাল ছিল, তা নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই পুলিশের।
কে এই চন্দ্রনাথ রথ?
আদতে পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর এলাকার বাসিন্দা চন্দ্রনাথের শৈশব কেটেছে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের আদর্শে। মেধাবী এই যুবক এক সময় ভারতীয় বায়ুসেনায় যোগ দিয়েছিলেন। তবে সেখানে বেশিদিন মন টেকেনি তাঁর। শোনা যায়, ছোট থেকেই তাঁর ঝোঁক ছিল আধ্যাত্মিকতার দিকে। বায়ুসেনার চাকরি থেকে স্বেচ্ছাঅবসর নিয়ে তিনি কিছুকাল একটি কর্পোরেট সংস্থায় কর্মরত ছিলেন। কিন্তু রাজনীতির অমোঘ টানে শেষ পর্যন্ত ময়দানে নামেন। চন্দ্রনাথের পরিবারও রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একটা সময় পরিবারের সবাই তৃণমূলের সমর্থক হলেও, বর্তমানে তাঁর মা হাসি রথ বিজেপির সক্রিয় নেত্রী।
২০১৯ সালে শুভেন্দু অধিকারী ছিলেন রাজ্যের জলসম্পদ মন্ত্রী। তারপর ২০২১ থেকে চন্দ্রনাথ তাঁর আপ্তসহায়ক হিসেবে কাজ শুরু করেন। গত কয়েক বছর ধরে তিনি তাঁর কার্যত ছায়াসঙ্গী হয়ে উঠেছিলেন। বছর চল্লিশের এই যুবক শুভেন্দুর দফতরের যাবতীয় খুঁটিনাটি কাজ অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে সামলাতেন। রাজনৈতিক মহলে চর্চা ছিল, নতুন সরকার গঠিত হলে এবং শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী পদে বসলে চন্দ্রনাথকে কোনও বড় প্রশাসনিক দায়িত্বে দেখা যেতে পারে। কিন্তু সেই স্বপ্নপূরণের আগেই সব শেষ হয়ে গেল।
তদন্তে নেমে পুলিশ ইতিমধ্যেই এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা নিজে ঘটনাস্থলে গিয়ে তদারকি করেছেন। বারাসত পুলিশ জেলার সুপার পুষ্পা জানিয়েছেন, খুনে ব্যবহৃত গাড়িটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, তবে তাতে ভুয়ো নম্বর প্লেট লাগানো ছিল।
অন্যদিকে, চন্দ্রনাথের দেহের ময়নাতদন্তের জন্য বারাসত মেডিক্যাল কলেজে তিন সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল গড়া হয়েছে। এলাকার নিরাপত্তা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মোতায়েন হয়েছে কেন্দ্রীয় বাহিনী। চন্দ্রনাথের আবাসন থেকে যশোর রোড পর্যন্ত রাস্তা আপাতত পুলিশি পাহারায় রয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানের আগে এই খুনের ঘটনায় রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলা নিয়ে নতুন করে চাপানউতোর শুরু হয়েছে।

