সময় বদলে গেছে। পারিপার্শ্বিকতাও। কিন্তু তার অনেকটাই যেন 'এহ বাহ্য', অর্থাৎ 'এটা বাইরের'। অন্তঃসলিলা চিরায়ত অনেক কিছুই।
পুলিশের গুলিতে বারুইপুরের নাবালিকা ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের অন্যতম মূল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলের মৃত্যু ঘিরে রাজ্য রাজনীতি তোলপাড়। পক্ষে-বিপক্ষে মতামতের ঝড়।
কিন্তু সন্তানকে হারিয়েও এমন 'শাস্তি'কে কাঙ্ক্ষিত বলে মন্তব্য করেছেন প্রভাসের মা সন্ধ্যা মণ্ডল। ছেলের বিরুদ্ধে ওঠা এই নৃশংস অপরাধের অভিযোগ ও পুলিশের গুলিতে তাঁর মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর সন্ধ্যা প্রথমেই জানিয়ে দেন, যা হয়েছে একদম ঠিক হয়েছে। দেহ নিতে যাওয়ার কোনও প্রশ্নই ওঠে না। বলেন, 'সন্তান মারা গেলে মায়ের কষ্ট হবেই। কিন্তু আমি যাব না। ও নেশা করত, মায়ের কথা শোনেনি। আমি গিয়ে ওকে এভাবে দেখে কী করব। পুলিশ আই কার্ড চেয়েছিল, আমি তাও জানি না কোথায় আছে। দেহ নিয়ে যা করার ওদের বলেছি করে নিতে।'
মায়ের পাশাপাশি স্বামীর শেষযাত্রায় শরিক হতে চাননি প্রভাসের স্ত্রী-ও। সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ গলায় বলেন, "ও বরাবরই নোংরা স্বভাবের লোক। তাই ও এই জঘন্য কাজটা করেনি, এমন দাবি আমি কোনওদিনই করতে পারব না। ও এই অপরাধ করতেই পারে, ও সব করতে পারে। আমার সঙ্গে বিয়ের পর থেকে ও কম অন্যায় করেনি। আমার ওপর লাগাতার অত্যাচার চালিয়েছে। সেই সমস্ত কিছু মুখ বুজে সহ্য করেই এতদিন সংসার চালিয়েছি। আজ ও নিজের দোষেই গুলি খেয়েছে।"
একটু ফিরে যাই। ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে সেমিনার হলে পৈশাচিকভাবে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। শুধু রাজ্য বা দেশ নয়, সেই ঘটনায় তোলপাড় হয়েছিল প্রায় গোটা দুনিয়া। ধৃত সঞ্জয়ের দিদির মুখেও শোনা গিয়েছিল একইরকম ক্ষোভ ও ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ। সংবাদমাধ্যমকে তিনি বলেছিলেন, "ওকে নিজের ভাই বলে পরিচয় দিতেও লজ্জা লাগে। ওর এত কুর্কীতি যে বাধ্য হয়েই আমরা ওর সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখিনি। মাকেও নিয়ে চলে এসেছি। বোনেরা মিলেমিশে মায়ের দেখাশোনা করি।" এও বলেছিলেন "আরজি করে ও যে নৃশংস ঘটনা ঘটিয়েছে তাতে ওর কঠোরতম শাাস্তি হওয়া উচিত। তবে সকলের কাছে একটাই অনুরোধ, আপনারা ওকে নিয়ে যা খুশি করুন, দয়া করে ওর দেহ আমাদের দেবেন না। আমরা নেব না। কারণ, এমন মানুষের সঙ্গে কোনও সম্পর্ক রাখা যায় না।"
কোন পরিস্থিতিতে এই প্রত্যাখ্যান? একেবারে নিজের একজন, যিনি সন্তান হতে পারেন, স্বামী হতে পারেন, ভাই হতে পারেন, তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার এই সাহস মানুষ কখন পান? মনোবিদ ঐন্দ্রিলা চ্যাটার্জির মতে, দস্যুর সঙ্গে আসলে কেউই থাকতে চান না। একেবারে নিজের লোক, সেও যদি অত্যন্ত খারাপ মানুষ হয় তাহলে মা-বোন-স্ত্রী তাঁকে পাল্টানোর চেষ্টা করেন। তাঁর কথায়, "বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় সন্তান খারাপ হয়ে গেলে মা তাকে পাল্টানোর চেষ্টা করেন। বারবার বলেন শুধরে যাও। স্বামী খারাপ হলে স্ত্রীও একই ভূমিকা নেন। কিন্তু বহুক্ষেত্রেই দেখা যায় এমন পরামর্শ দেওয়ার জন্য আরও অত্যাচারিত হতে হয় তাঁদের। তাই সেই লোক পুলিশ হেফাজতে গেলে বা তার মৃত্যু হলে অজান্তেই নিজের ভিতরে চেপে রাখা ক্ষোভের বাইরে বেরিয়ে আসে। এটা খুবই স্বাভাবিক একটা প্রবণতা।"
একইসঙ্গে তিনি মনে করিয়ে দিলেন সামাজিক মনস্তত্ত্বও। ঐন্দ্রিলার কথায়, "আমার সন্তান বা স্বামী অপরাধী হলেও আমি নই, এটা প্রতিষ্ঠারও একটা সামাজিক দায়ও মানুষের থাকে। সে যতই কাছের মানুষ হন, তাঁর পাপের বোঝা শুধুমাত্র তারই, এটা বোঝানোর একটা চাপ থাকে। তাই কোনওভাবেই বারুইপুরে পুলিশের এনকাউন্টারে মৃত প্রভাসের মা বা স্ত্রী, অন্যদিকে আরজি কর কাণ্ডে দোষী সঞ্জয়ের দিদির ভূমিকা অবাক করা নয়।"
রত্নাকরের দস্যুবৃত্তিতে অতিষ্ঠ ছিলেন মানুষ। একদিন নারদ মুনির গতিরোধ করেছিলেন রত্নাকর। পরিবারের ভরণপোষণের জন্য দস্যুবৃত্তি করেন বলে মুনিকে জানিয়েছিলেন রত্নাকর। কিন্তু পরিবার কি এই পাপের দায় নেবে? মুনির প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পরিবারের কাছে গেলে কেউই সেই দায় নিতে চাননি। তারপরেই হুঁশ ফিরেছিল তাঁর। কঠিন তপস্যায় জন্ম হয়েছিল বাল্মিকীর।
মনোবিদ ঐন্দ্রিলার কথায়, "একসময় হয়তো ক্ষোভের আগুন নিভে যাবে পরিবারের মানুষের। তখন আবার ফিরে দেখার পালা। তবে হারিয়ে ফেলা মানুষটার জন্য চোখের জল যে আসবেই তার নিশ্চয়তা নেই।"

