দ্য ওয়াল ব্যুরো: প্রথমে মনে হয়েছিল ভয়াবহ পথ দুর্ঘটনা। আগুনে পুড়ে যাওয়া একটি গাড়ির ভিতর থেকে উদ্ধার হয় চার জনের দেহ। কিন্তু তদন্ত যত এগিয়েছে, ততই সামনে এসেছে শিউরে ওঠার মতো তথ্য। রাজস্থানের আজমেরে প্রাক্তন সরপঞ্চ রাম সিং চৌধুরী, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী, মা এবং ভাইঝির মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁরই ১৭ বছরের ছেলেকে।
পুলিশের দাবি, সম্পত্তি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং দীর্ঘদিনের পারিবারিক ক্ষোভ থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের ছক কষা হয়েছিল।
আগুনে পুড়ে যাওয়া গাড়ির ভিতর থেকে উদ্ধার হয়েছিল রাম সিং চৌধুরী, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সুরজ্ঞান, মা পুসি দেবী এবং ভাইঝি মহিমার দেহ। প্রথমে পরিবারের তরফে দাবি করা হয়েছিল, অসুস্থ মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে আগুন লেগে এই দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু তদন্তকারীদের সন্দেহ জাগে ঘটনাস্থলের বেশ কিছু অসঙ্গতি দেখে।
তদন্তে দেখা যায়, গাড়ির সামনের আসনে কেউ বসে ছিলেন না। পাশাপাশি মৃত সুরজ্ঞানের শরীরে আগুন লাগার আগেই ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন ছিল। এর পরই দুর্ঘটনার তত্ত্ব থেকে সরে এসে খুনের মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করে পুলিশ।
তদন্তকারীদের নজরে আসে আরও একটি বিষয়। পরিবারের অন্য সদস্যরা শোকে ভেঙে পড়লেও ১৭ বছরের কিশোরটি ছিল অস্বাভাবিকভাবে শান্ত। মায়ের পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিতে এবং স্বাভাবিকভাবে চা খেতেও দেখা যায়। সেই আচরণই শেষ পর্যন্ত তদন্তকারীদের সন্দেহ বাড়িয়ে দেয়।
আজমেরের পুলিশ সুপার হর্ষ বর্ধন জানিয়েছেন, রাম সিংয়ের দ্বিতীয় বিয়ের পর থেকেই পরিবারে অশান্তি বাড়তে শুরু করে। পুলিশের দাবি, কিশোর ও তার পরিবারের একাংশ মনে করত যে প্রথম স্ত্রীকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি বাড়ির পরিবেশে নিজেকে ক্রমশ কোণঠাসা মনে করত সে। এই ক্ষোভই ধীরে ধীরে ভয়ঙ্কর রূপ নেয়।
আজমের থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরের শ্রীরামপুরা গ্রামের একটি খামারবাড়িতে দুই স্ত্রী, মা ও ভাইঝিকে নিয়ে থাকতেন রাম সিং। পুলিশের অভিযোগ, প্রায় পাঁচ মাস ধরে হত্যার পরিকল্পনা করছিল কিশোরটি। অপরাধভিত্তিক ধারাবাহিক অনুষ্ঠান দেখত এবং দীর্ঘ সময় অনলাইনে খেলায় কাটাত। তদন্তকারীদের দাবি, অপরাধ সংঘটনের কৌশল ও প্রমাণ নষ্ট করার উপায় সম্পর্কেও সে ধারণা তৈরি হয়েছিল সেখান থেকে।
ঘটনার রাতে রাম সিং ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী মদ্যপান করে ঘুমিয়ে পড়েন। পুলিশের দাবি, ভোররাত পর্যন্ত জেগে থাকার পর কিশোরটি বাবার ঘরে ঢুকে তাঁর কানের কাছে ছুরি দিয়ে আঘাত করে। সেই আঘাতেই রাম সিংয়ের মৃত্যু হয় বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু এরপর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। চিৎকার শুনে জেগে ওঠেন সুরজ্ঞান। পরে ঘটনাস্থলে এসে পড়েন পুসি দেবী ও মহিমাও।
পুলিশের অভিযোগ, তখন কিশোরটির মা এবং তার বোনও ঘটনাস্থলে এসে তাকে সাহায্য করেন। চার জনকেই খুন করা হয়। তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, পরিবারের আর্থিক লেনদেন, জমিজমা এবং ব্যাঙ্কের কাজকর্ম দেখাশোনা করতেন মহিমা। ফলে সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।
খুনের পর ঘটনাকে দুর্ঘটনা বলে দেখাতে মৃতদেহগুলি একটি গাড়িতে তুলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্ন এবং গাড়ির পিছনের অংশে চারটি দেহ একসঙ্গে পাওয়া যাওয়ার ঘটনাই সেই পরিকল্পনা ভেস্তে দেয়। শেষ পর্যন্ত কিশোরটির অস্বাভাবিক শান্ত আচরণই তদন্তকে সঠিক পথে নিয়ে যায় এবং গোটা ঘটনার রহস্য উন্মোচিত হয়।

