পশ্চিমবঙ্গে নতুন সরকারের অন্যতম ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' (annapurna bhandar portal) নিয়ে এক বিরাট ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। শুক্রবার উত্তরবঙ্গ সফরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই প্রকল্পের সুবিধা শুধুমাত্র 'যোগ্য' আবেদনকারীরাই পাবেন।
একই সঙ্গে কারা এই ভাতার জন্য সম্পূর্ণ অযোগ্য, তার একটি তালিকাও প্রকারান্তরে জানিয়েছেন তিনি। এবং সেখানেই স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, যাঁরা সরকারি ভ্যাকসিন (Vaccine) নেননি, তাঁরা এই ভাতা পাবেন না।
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী আরও দুই মাস অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ফর্ম ফিলাপ (annapurna bhandar online apply 2026) প্রক্রিয়া চলবে। তবে ফর্ম জমা দেওয়ার আগে দেখে নিতে হবে এই নতুন শর্তগুলি।
কাদের 'অযোগ্য' বলছেন মুখ্যমন্ত্রী?
শুভেন্দু অধিকারী স্পষ্ট ভাষায় বলেন, 'অভারতীয়রা এই প্রকল্পের সুবিধা কোনওভাবেই পাবেন না। যাঁরা সরকারি ভ্যাকসিন বা টিকা নেননি, তাঁরা পাবেন না, যাঁরা তিনটি বিয়ে করেছেন, তাঁরা পাবেন না, আর যাঁরা সরকারি বিদ্যালয়ে না পড়িয়ে নির্দিষ্ট ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শিক্ষা দেন, তারা এই সুবিধা পাবেন না'।
এখন কৌতূহলের বিষয় হল কোন ভ্যাকসিনের কথা বলতে চাইলেন মুখ্যমন্ত্রী?
এই বিষয়ে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, মুখ্যমন্ত্রী মূলত শিশুদের জন্য সরকারের চালানো জাতীয় টিকাকরণ কর্মসূচির (UIP) কথা বুঝিয়েছেন। যে সমস্ত পরিবার বা অভিভাবকরা তাঁদের সন্তানদের এই বাধ্যতামূলক সরকারি টিকা দেননি বা দিতে চান না, তাঁরা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্পের জন্য ফর্মেও এই মর্মে উল্লেখ রয়েছে। পরিবারের সন্তান সন্ততি সরকারি টিকা নিয়েছে কিনা।
তাই জেনে রাখা প্রাসঙ্গিক যে সরকারি নিয়মে শিশুদের কোন কোন টিকা দেওয়া বাধ্যতামূলক?
কেন্দ্রীয় সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন (National Health Mission)-এর অধীনে সর্বজনীন টিকাকরণ কর্মসূচির (UIP) মাধ্যমে শিশুদের ১১টি মারাত্মক রোগের হাত থেকে বাঁচাতে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে টিকা দেওয়া হয়। এছাড়া যেসব এলাকায় রোগের প্রকোপ বেশি, সেখানে জাপানিজ এনসেফালাইটিস (Japanese Encephalitis)-এর টিকাও দেওয়া হয়। কলকাতার সরকারি U-WIN প্ল্যাটফর্মে এই টিকার সমস্ত রেকর্ড অনলাইনে ট্র্যাক করা যায়। এখন দেখে নেওয়া যেতে পারে সেই বাধ্যতামূলক টিকার তালিকা।
জন্মের সময় দেওয়া হয় বিসিজি (BCG) - যা যক্ষ্মা প্রতিরোধ করে। ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (OPV) - যা পোলিও প্রতিরোধ করে। এবং হেপাটাইটিস বি টিকা।
৬, ১০ ও ১৪ সপ্তাহ বয়সে দেওয়া হয় পেন্টাভ্যালেন্ট টিকা (ডিপিটি, হেপাটাইটিস বি ও Hib-এর বিরুদ্ধে), ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (OPV), আইপিভি (IPV) - ইনজেকশনের মাধ্যমে পোলিও টিকা, রোটাভাইরাস টিকা, পিসিভি (PCV) - নিউমোনিয়া প্রতিরোধের টিকা।
৯ মাস বয়সে দেওয়া হয় হাম-রুবেলা (MR) টিকা ও জাপানিজ এনসেফালাইটিসের প্রথম ডোজ (যেখানে প্রযোজ্য)।
১৬ থেকে ২৪ মাস বয়সে দেওয়া হয় ডিপিটি বুস্টার, এমআর (MR)-এর দ্বিতীয় ডোজ, ওরাল পোলিও ভ্যাকসিন (OPV) ও পিসিভি (PCV) বুস্টার।
৫-৬ বছর বয়সে দেওয়া হয় ডিপিটি (Td) বুস্টার ডোজ।
১০ ও ১৬ বছর বয়সে দেওয়া হয় টিডি (Td) টিকা, যা টিটেনাস ও প্রাপ্তবয়স্কদের ডিফথেরিয়া থেকে সুরক্ষা দেয়।
রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মুখ্যমন্ত্রী এখানে পরোক্ষভাবে রাজ্যের একাংশ কট্টরপন্থী সংখ্যালঘুর কথা বুঝিয়েছেন, যাঁরা এখনও নানা কুসংস্কারের বশে পোলিও বা অন্যান্য সরকারি টিকা সন্তানদের দিতে চান না। এই প্রসঙ্গে এক আমলা মনে করিয়ে দেন, প্রাক্তন মুখ্য সচিব মনোজ পন্থ যখন মুর্শিদাবাদের জেলাশাসক ছিলেন, তখন একটি সংখ্যালঘু গ্রামে পোলিও টিকার সচেতনতা বাড়াতে নিজের দুই মেয়েকে নিয়ে গিয়ে সবার সামনে পোলিও খাইয়েছিলেন।
মুখ্যমন্ত্রীর এদিনের নতুন বার্তার পর এটি স্পষ্ট যে, এবার সামাজিক ভাতার সুবিধা পেতে গেলে নাগরিকদের সরকারি স্বাস্থ্যবিধি ও নিয়মকানুন মানা বাধ্যতামূলক করছে নবান্ন।

