দ্য ওয়াল ব্যুরো: নিউ জার্সির মেঘমুক্ত আকাশ। স্পেনের কাছে ফাইনাল হার। মাঠে তখন চূড়ান্ত বিশৃঙ্খলা। লিয়ান্দ্রো পারেদেস ও নাহুয়েল মোলিনারা কার্যত হাতাহাতিতে লিপ্ত। এক চূড়ান্ত কুৎসিত ও কলঙ্কিত প্রহর।
ঠিক সেই আবহে তিনি দাঁড়িয়ে একা। কাঁদছেন। সতীর্থদের পেশিশক্তির নোংরা আস্ফালনের মধ্যে ঠিক যেন একাকী ঈশ্বর।
ছাব্বিশের বিশ্বকাপের (FIFA World Cup 2026) সেই ফাইনাল হয়ে রইল লিওনেল মেসির শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ৩৯ বছর বয়সে এসে আর্জেন্তিনার পাকাপাকিভাবে তুলে রাখলেন নীল-সাদা জার্সি। অবসরের বিবৃতি বেশ দীর্ঘ। কিন্তু বয়ান ছাপিয়ে সে দিনের সেই বিষণ্ণ শূন্য দৃষ্টিই যেন বলে দিল অনেক না-বলা-কথা।
পেশিশক্তির ভিড়ে একাকী সাধক
মাঠে চরম অসভ্যতার প্রদর্শনী। স্প্যানিশদের উপর গায়ের জোর ফলাতে ব্যস্ত আর্জেন্তিনীয় ব্রিগেড। অধিনায়ক হিসেবে হয়তো তাঁর উচিত ছিল সতীর্থদের কড়া হাতে শাসন করা। কিন্তু মেসি তা করেননি। মার্ক কুকুরেয়াকে লাল কার্ড দেখানোর জন্য রেফারির কাছে হয়তো আবেদন করেছিলেন। কিন্তু দলের বাকিদের মতো হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হননি।
গত দু'দশক ধরে আর্জেন্তিনার (Argentina Football Team) এই উগ্র ফুটবলীয় সংস্কৃতির ভিড়ে তিনি বরাবরই ছিলেন শান্ত ও সংযত। একুশ শতকের ফুটবলে লিও মেসি এমন এক দেবতা, যাঁর সম্পর্কে স্বয়ং পোপ ফ্রান্সিসকে বলতে হয়েছিল, ওকে ঈশ্বর বলাটা ধর্মবিরোধী! কিন্তু সেই দেবসুলভ আবেশই মেসিকে উশৃঙ্খল জনতার ভিড় থেকে আজীবন আলাদা করে রাখে।
কান্নায় ভাসছে গোটা দেশ
অবসরের সিদ্ধান্ত আচমকা আসেনি (Lionel Messi Retirement)। স্পেনের কাছে ফাইনাল হারের হতাশা এবং চলতি মাসের শুরুতে বাবার প্রয়াণ মানসিকভাবে কুরে কুরে খাচ্ছিল। জর্জ নিছক পিতা নন, ছিলেন আজীবনের মেন্টর। এই পিতৃবিয়োগ তাঁর অবসরের সিদ্ধান্তকে ত্বরান্বিত করেছে।
বুটজোড়া তুলে রাখার খবরটা প্রকাশ্যে আসতেই স্তব্ধ গোটা আর্জেন্তিনা। লাইভ সম্প্রচারের সময় বুয়েনস আইরেসের স্পোর্টস অ্যাঙ্কর পাবলো জিরাল্ট বাকরুদ্ধ। অগণিত তরুণ ভক্ত কান্নায় ভেঙে পড়েছে। বাবা-মাকে ফোন করে আর্তনাদ করেছে ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। গোটা দেশের কাছে এই বিদায় যেন এক অসহনীয় শূন্যতা।
হাঁটতে হাঁটতেই জাদুর ছোঁয়া
বয়স ৩৯। কিন্তু জাদুকরের তুলি ছিল অমলিন। সদ্যসমাপ্ত বিশ্বকাপেও তিনি ছক ভেঙেছেন। আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক। ভেঙেছেন মিরোস্লাভ ক্লোজের বিশ্বকাপে সর্বাধিক গোলের রেকর্ড। মিশর ও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে খাদের কিনারা থেকে দলকে টেনে তোলা। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে সেমিফাইনালে পিছিয়ে থাকা অবস্থায় ডান প্রান্তে দাঁড়িয়ে নিখুঁত অঙ্কে ছকেছেন বিপক্ষের বিপর্যয়। বল ছাড়া তাঁকে কিছুই করতে হত না। মাঠে স্রেফ টহল দিতেন। যেন নিজের বাগানে আনমনে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! কিন্তু বল পেলেই মুহূর্তে প্রতিপক্ষের সর্বনাশ (World Cup Records)। এবারই তো ডান প্রান্ত থেকে দুটি মাপা ক্রসে ভেঙে দিয়েছিলেন ব্রিটিশদের স্বপ্ন! বার্সেলোনায় ১৭ বছরের দাপুটে কেরিয়ার। আর দেশের হয়ে ২০৭টি ম্যাচে ১২৫টি গোল। মেসির এই পরিসংখ্যান নিছক ডিজিট নয়, মহাকাব্যিক গরিমায় উজ্জ্বল!
চোখের জলে বিদায়
২০২২ সালে সৌদি আরবের কাছে হারের পর খাদের তলানিতে পৌঁছেছিল দল। সেখান থেকে ২৬ দিনের ম্যাজিকে বিশ্বজয়ী। ট্রফি নিয়ে দেশে ফিরলে বুয়েনস আইরেসের রাস্তায় এমন জনসমুদ্র তৈরি হয় যে, বাসযাত্রা বাতিল করে কপ্টারে উড়তে হয়েছিল দলকে।
দোহায় বিশ্বকাপ জেতার পর মাঝরাতে মেট্রো স্টেশনে নেপালি ও বাংলাদেশি শ্রমিকদের 'মেসি, মেসি' চিৎকার (Football News)। উন্মাদনা প্রমাণ করে, লিও-র জাদু কোনও ভৌগোলিক সীমানায় আটকে নেই। শেষ বিদায়ের বার্তায় মেসি লিখেছেন, 'আর্জেন্তিনীয় করে পাঠানোর জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।'
অথচ নির্ণায়ক বিদায়টা হল চূড়ান্ত হতাশায়। স্পেনের বিরুদ্ধে পরাজয়ে সতীর্থদের অখেলোয়াড়সুলভ আচরণের জন্য আর্জেন্তিনাকে ২ লক্ষ ৩৬ হাজার পাউন্ড জরিমানাও গুনতে হয়েছে। পেলের প্রস্থানমঞ্চ ছিল যুগোস্লাভিয়ার বিরুদ্ধে একটি ম্যাড়মেড়ে ড্র। মারাদোনার বিদায় ঘটেছিল ডোপ পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে। তেমনই মেসির অলবিদায় মিশে থাকল ট্রফি না জেতার আক্ষেপ, সতীর্থদের সৌজন্যে রচিত হল কুৎসিত দৃশ্য।
কিন্তু তাতে তাঁর ভাবমূর্তি বিন্দুমাত্র কালিমালিপ্ত হয়নি। তিনটে বিশ্বকাপ ফাইনাল, ২১টি বিশ্বকাপ গোল এবং অসংখ্য চোখধাঁধানো মুহূর্ত। এক উশৃঙ্খল ও আগ্রাসী শিবিরে জাদুকর মেসি আজীবন পূজিত হবেন নিভৃত ঈশ্বর হিসেবেই।

