দ্য ওয়াল ব্যুরো: আলিপুর আবহাওয়া দফতরের পূর্বাভাস ছিলই যে আজ বিকেলেই শুরু হবে কালবৈশাখীর তাণ্ডব (Kalboishakhi in Kolkata)। সকাল থেকেই কলকাতার দমবন্ধ করা ভ্যাপসা গরমের পর দুপুর দুটো নাগাদ ঘুটঘুটে অন্ধকার নেমে এল শহরের বুকে। মরসুমের অন্যতম ভয়ঙ্কর কালবৈশাখী দেখল রাজ্য (West Bengal weather update)।
হাওয়া অফিস জানিয়েছে, শুক্রবার দুপুর ২টো ৪৫ মিনিট থেকে ২টো ৪৭ মিনিটের মধ্যে আলিপুরে ঝড়ের সর্বোচ্চ গতিবেগ ছুঁয়েছিল ঘণ্টায় রেকর্ড ৮৮ কিলোমিটার! অন্যদিকে, দমদমে দুপুর ২টো ২৯ মিনিট থেকে ২টো ৩০ মিনিটের মধ্যে ঝড়ের গতি ছিল ঘণ্টায় ৭৪ কিলোমিটার (west bengal storm)। পুলিশ সূত্রে খবর, ঝড়ের সময় চিলড্রেনস পার্ক সংলগ্ন আউট্রাম ঘাটের কাছে আম কুড়োতে গিয়ে মৃত্যু হয় এক যুবকের। ঝোড়ো হাওয়ায় একটি বিশালাকার গাছের ডাল ভেঙে পড়ে চক্ররেলের ওভারহেড তারের ওপর। তার ছিঁড়ে মুহূর্তে সেখানে আগুন ধরে যায় এবং সেই আগুনের গ্রাসেই ঘটনাস্থলে প্রাণ হারান ওই যুবক (west bengal kalboishakhi effect)।
ঝড়ের মারাত্মক প্রভাব পড়েছে কলকাতার যোগাযোগ ব্যবস্থাতেও। দৃশ্যমানতা কম থাকায় এবং তীব্র ঝড়ো হাওয়ার কারণে শুক্রবার দুপুরে প্রায় এক ঘণ্টার জন্য কলকাতা বিমানবন্দরে বিমানের ওঠানামা সম্পূর্ণ বন্ধ রাখতে হয়। চরম ভোগান্তির শিকার হন বিমানযাত্রীরা। একই অবস্থা রেল পরিষেবাতেও। শিয়ালদহ উত্তর শাখার মধ্যমগ্রাম স্টেশনের কাছে লাইনের ওপর গাছ ভেঙে পড়ায় বনগাঁ শাখায় বেশ কিছুক্ষণের জন্য ট্রেন চলাচল থমকে যায়। অন্যদিকে, হাওড়া ও হুগলি জেলাতেও ৫০ থেকে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়বৃষ্টি চলে। ব্যান্ডেল-কাটোয়া শাখাতেও ঝড়ের তাণ্ডবে গাছ উপড়ে গিয়ে ট্রেন চলাচল স্তব্ধ হয়ে পড়ে।
ঝড়ের দাপটে কলকাতার একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় গাছ উপড়ে পড়েছে। ময়দানে এসএসকেএম হাসপাতালের কাছে একটি বিশালাকার গাছ ভেঙে পড়ায় দক্ষিণ কলকাতার অন্যতম লাইফলাইন এজেসি বোস রোডে গাড়ি চলাচল বিঘ্নিত হয়। এ ছাড়া রাসবিহারী, রবীন্দ্র সরোবর, নেতাজি নগর, টালিগঞ্জ, হরিশ মুখার্জি রোড, রিপন স্ট্রিট, পার্ক স্ট্রিট মল্লিক বাজার এলাকাতেও গাছ ভেঙে পড়ে যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঝড়ো হাওয়ায় ছিঁড়ে লুটিয়ে পড়েছে বহু হোর্ডিং ও রাজনৈতিক পোস্টার। কিছু জায়গায় গাছ উপড়ে পড়ে রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়, আবার কোথাও দেখা যায় গাড়ির মাথাতেও ভেঙে পড়ে রয়েছে গাছ, কার্যত দুমড়ে গিয়েছে সেই গাড়ি।
বৃষ্টির জেরে উত্তর ও মধ্য কলকাতার চেনা পকেটগুলিতে জল জমে বিপত্তি বাড়ে। চাঁদনি চক এবং ঠনঠনিয়ার রাস্তায় জল জমে দুর্ভোগ তৈরি হয়। ঝড়ের দাপট থেকে রেহাই পায়নি দক্ষিণ কলকাতার বিলাসবহুল 'সাউথ সিটি মল'-ও। সেখানে ঝড়ো হাওয়ায় কাচ ভেঙে ভেতরে বৃষ্টির জল ঢুকে আসে। জোকা-তারাতলা রুটের ক্ষুদিরাম মেট্রো স্টেশনের ছাদের একাংশ ভেঙে পড়ে হুহু করে জল ঢুকতে শুরু করে স্টেশনের ভেতরে।
ইতিমধ্যেই হুগলি জেলার একাধিক প্রান্ত থেকে ক্ষয়ক্ষতির খবর আসছে। সিঙ্গুরের দিয়ারা এলাকায় ১২ নম্বর রাজ্য সড়কে গাছ পড়ে যান চলাচল সম্পূর্ণ থমকে যায়। বৈদ্যবাটি-তারকেশ্বর ১২ নম্বর রাজ্য সড়কেও গাছ উপড়ে পড়ায় গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়েই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছয় সিঙ্গুর ব্লক প্রশাসন। আধুনিক কাটার মেশিন দিয়ে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় গাছের ডালপালা কেটে রাস্তা পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়। হুগলির বৈঁচিগ্রামে একটি শতাব্দীপ্রাচীন বটগাছ উপড়ে গিয়েছে। পাশাপাশি বাঁশবেড়িয়া পুরসভার ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের জুট মিল কলোনিতেও একটি প্রাচীন অশ্বত্থ গাছ উপড়ে পড়েছে।
ব্যান্ডেল-কাটোয়া শাখায় শুক্রবার দুপুর ২টো ৪৫ মিনিট নাগাদ কাটোয়া রেল গেটের কাছে একটি গাছ ভেঙে ওভারহেড লাইনে পড়ে। ঠিক সেই সময় একটি আপ কাটোয়া লোকাল ব্যান্ডেল স্টেশন ছেড়ে আসছিল, গাছ পড়ার কারণে মাঝপথেই দাঁড়িয়ে পড়ে ট্রেনটি। প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে রেলের টেকনিক্যাল টিম ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী গাছটি সরিয়ে লাইনের তার মেরামত করার পর ওই শাখায় ট্রেন চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়। আবহাওয়া দফতর জানাচ্ছে, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আসা এই মেঘের জেরে আগামী কয়েক ঘণ্টা জেলাগুলিতে এই দুর্যোগের রেশ বজায় থাকবে।
আজ দুপুর দুটো নাগাদ হাওয়া অফিস কলকাতা, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুরে ঝড়বৃষ্টির পূর্বাভাস দিয়ে হলুদ সতর্কতা জারি করেছিল। তার পরেই সল্টলেক, ধর্মতলা, যাদবপুর - সর্বত্র ঝমঝমিয়ে বজ্রবিদ্যুৎ-সহ বৃষ্টি শুরু হয়। আলিপুর আবহাওয়া দফতর ইতিমধ্যেই পূর্ব বর্ধমান, হাওড়া, হুগলি, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়গ্রামে 'লাল সতর্কতা' (Red Alert) জারি করেছে। এই জেলাগুলিতে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টির পাশাপাশি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৭০ কিলোমিটার গতিতে ঝড়ের পূর্বাভাস রয়েছে। অন্যদিকে নদীয়া জেলাতেও ৪০ থেকে ৫০ কিমি বেগে ঝড়ের সঙ্গে হালকা বৃষ্টির পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

