তবে কি সব বানানো? সাজানো? গোছানো? যে অনভ্যস্ত হাতের স্পর্শ, যে থতমত উপস্থাপনার সারল্য, যে আটপৌরে চালচিত্রের উপস্থিতির জন্য ভিডিওগুলো এত ভাল লাগত… সহজ কথার সহজতা বুদ্ধির মারপ্যাঁচ ডিঙিয়ে অন্তস্তল স্পর্শ করত… সবই মিছে? ঝুটমুট? আড়ালে এজেন্সির পেশাদার কূটনীতি? একাধিক সংস্থার সুচতুর বিনিয়োগ?
তারাই পূজা… পূজারিণী প্রধানকে (Pujarini Pradhan) সামনে রেখে আমজনতাকে ধোঁকা দিল? যে ভারী ভারী, মোটা মোটা হার্ডকভার ইংরেজি বইকে এক ঝলকের রিলে সামনে টেনে নিজের ভাললাগাটুকু ইজহার করতেন পূর্ব মেদিনীপুরের এক ছাপোষা গৃহিণী, পাশ্চাত্য চলচ্চিত্রের সমান্তরাল ঘরানার বুদ্ধিদীপ্ত (লঘু, ঘরোয়া আড্ডায় 'আঁতেল') ছায়াছবির উল্লেখ করে তুল্যমূল্য বিচার নামাতেন, নারীর পোশাক বাছাইয়ের স্বাধীনতা থেকে মুক্তপ্রেম—পতপত করে নারীবাদের পতাকা ওড়াতেন নিভু নিভু আলো-মাখা ঘরে বসে, আর আমি, আপনি… আমরা সবাই এতদিনের কত অজস্র বলতে না পারা কথা এভাবে নম্র স্বরে অথচ সোচ্চারে দশদিকে ছড়িয়ে পড়ছে দেখে নিজেদেরই জিত বলে মনে করতাম, একটা জোরে আটকে থাকা ঢাকনা ফেটে বেরিয়ে আসত একরাশ হতাশা, একদলা অবসাদ আর একবুক কান্না…
সে সবই স্টেজড? অভিনয়? আমরা পণ্যায়িত হলাম? ব্যবহার করা হল আমাদের প্রশ্ন না তোলা আবেগ আর বিশ্বস্ত অনুভূতিকে? পূজারিণী ঠিক ততটা গ্রামীণ নন, যতটা ভেবেছিলাম? ততখানি সরল নন, যতখানি বুঝেছিলাম? তিনি এতদিন যা কিছু 'লিবারাল' বুলি শোনালেন, সবই আসলে 'পুঁজিবাদে'র পণ্য! হায়, আমাদের সঙ্গে তঞ্চকতা করা হল। আমরা ঘোরতরভাবে বঞ্চনার শিকার!
এতদিন নিশ্ছিদ্র জনাদর পেয়ে আসা 'কন্টেন্ট ক্রিয়েটর' পূজারিণী প্রধানের (চ্যানেল: লাইফ অফ পূজা) একবগগা স্তুতি, প্রশ্নাতীত সমর্থন গত কয়েক দিন ধরে ঈষৎ টাল খেয়েছে (Life of Puja)। জমে উঠেছে 'এক্সপোজ' করার জিগির। করছেন যাঁরা, তাঁরা মুখ্যত পূজার ময়দানের লোক। কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী, কেউ সহযোদ্ধা। পোশাকি নাম 'কন্টেন্ট ক্রিয়েটর'। বাংলার প্রায় অন্ত্যজ গ্রামের পিছিয়ে থাকা তল্লাটে অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে আসা এক মেয়ে এত স্বল্প সময়ে এমন ঊর্ধ্বমুখী জনপ্রিয়তা পেল কোন রহস্যে, তার সুলুকসন্ধানে নেমে নীরাহিকা জৈন নামক জনপ্রিয় ইনফ্লুয়েন্সার একটি ভিডিও পোস্ট করেন।
সেই শুরু। এরপর ব্যাটন হাত বদলে যায়। আরেক ক্রিয়েটর ঐশ্বর্য সুব্রহ্মণ্যম বিষয়ের গভীরে যান। অনেক ছানবিন চালান। অতঃপর আড়ালে থাকা এক ধূসর জগতের তলদেশ ফুঁড়ে বের করেন: পূজারিণী প্রধানকে (Pujarini Pradhan) যেমনটা দেখা যায়, তিনি তেমনটা নন। তাঁকে সামনে আনা হয়। আনে একটা মার্কেটিং টিম। তারাই ভিডিও শুট করে। এডিটের কাঁচি চালায়। তারপর আপলোডের পালা। রীতিমতো টাকার চুক্তিতে। যে অরগ্যানিক সারল্য দেখে আমজনতা বুঁদ, সেটা আদতে স্ক্রিপ্টেড। বানানো। ওই থমকানো, ওই আড়ষ্টতা… স্বতঃস্ফূর্ত নয়। প্ল্যান ছকে করা।
এই প্রেক্ষিতে জানানো যাক, বক্তব্যের সপক্ষে দুই ইনফ্লুয়েন্সারই কোনও তথ্য-সাবুদ পেশ করতে পারেননি। কারা সেই টিম, কোন এজেন্সির বদান্যতায় 'কাজ' করেন পূজা, লক্ষ্যণীয়ভাবে, অনুল্লেখিত। টাকার লেনদেন, লাভের অঙ্ক—একইভাবে—কেউ টুঁ শব্দটি করেননি।
উলটে ভিডিও বানিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনে নেমেছেন পূজা (Pujarini Pradhan)। জানিয়েছেন, এজেন্সির সঙ্গে তিনি চুক্তিবদ্ধ ঠিকই। কিন্তু তার সঙ্গে ভিডিও বানানো, কন্টেন্টের বিষয় নির্বাচন কিংবা এডিটিং-আপলোডের কোনও সম্পর্ক নেই। কোন সংস্থা প্রথমে এসেছিল, কথা দিয়েও কথা রাখেনি, কমিশন বাবদ তিনি নিজে কত পেয়েছেন… ঢাকঢাক গুড়গুড় না করে সোজাসাপটা মেলে ধরেছেন পূজারিণী প্রধান। যে মৌচাকে দিনেদুপুরে ঢিল মারার শ্লাঘাবোধ করছিলেন নীরাহিকা-ঐশ্বর্যরা, তাঁদের আচমকা পালটা হুল ফুটিয়েছেন। প্রত্যাশিতভাবে, কারও নাম না করে, যথোচিত সম্মান ও সহবত দেখিয়ে।
গোটা আলোচনায় একটা শব্দবন্ধ বেশ জোরালো চর্চায়। 'ইন্ডাস্ট্রি প্ল্যান্ট'। শুনলে মনে হয় কৃত্রিমভাবে জন্মানো পণ্য। বাজারের হাত ধরে তৈরি। কিন্তু সওয়াল উঠবে—যে পূজারিণীর গায়ে এই লেবেল সেঁটে দিলেম, তিনি কোন মাপকাঠিতে 'প্ল্যান্টেড'? আর ঠিক কোন নিরিখে শহরের বাকি ইনফ্লুয়েন্সাররা 'অরগ্যানিক'?
দিল্লি বা মুম্বইয়ের বড় ঘরের মেয়ে যখন ক্যামেরার সামনে বসে সিনেমা নিয়ে বা বই নিয়ে কথা বলেন, পিছনে থাকে রিং লাইট, ব্র্যান্ড ডিল, ম্যানেজার, কন্টেন্ট ক্যালেন্ডার। কেউ তাঁকে 'প্ল্যান্টেড' বলে না। তাঁর পরিশীলিত উচ্চারণ, সিনেমা স্কুলের ডিগ্রি, বাবার বানানো বইয়ের আলমারি—এগুলো 'নিপাট পেশাদারিত্ব'। অথচ পূর্ব মেদিনীপুরের পূজারিণীর ক্ষেত্রে তাঁর কমদামি অন্দরসজ্জা, সস্তা গৃহসাজ হয়ে যায় 'ম্যানিপুলেশন'!
তফাতটা কোথায়? কন্টেন্টে? নাকি কন্টেন্ট নির্মাতার ঠিকানায়? তাঁর লিঙ্গ পরিচয়ে? তাঁর শ্রেণিতে? তাঁর উচ্চারণে? প্রান্ত থেকে উঠে আসা এক নারী যদি সফল হন, তাঁর সাফল্যকে 'বিশুদ্ধ' থাকতে হবে… এই মাথার দিব্যি কে দিয়েছে? তাঁর ক্ষেত্রে কোনও পরিকল্পনা চলবে না। সাহায্যকারী দল থাকা অনুচিত। কোনও এজেন্সির নির্দেশনাই বা কেন দেখা যাবে? শহুরে ইনফ্লুয়েন্সাররা এই সমস্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। তাঁরা চিন্তামুক্তভাবে টিম নিয়ে কাজ করুন। প্রান্তিক ইনফ্লুয়েন্সাররা পেশাদার হলেই প্ল্যান্টেড!
এই দ্বৈত মাপকাঠিই বিতর্কের মূলে। পূজা নিজে যা জানিয়েছেন, তা মাথায় রাখার মতো। বলেছেন, 'ওরা মনে করে আমার হার্ডকভার বই থাকতে পারে না। কিন্তু আমার বায়োতে 'অ্যামাজন উইশলিস্ট' লেখা ছিল। অনেক অনুরাগী বই উপহার দিয়েছেন!' কৈফিয়তের ভিডিওতে জুড়ে দিয়েছেন, 'ওরা সন্দেহ তুলল… আমি কালার গ্রেডিং শিখলাম কীভাবে? কিন্তু সত্যি বলতে এটা কি খুব কঠিন? এ তো যে কেউ শিখতে পারে!' আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পূজার পরের মন্তব্য: 'ওরা ঠিক ছিল যতক্ষণ আমি নারীবাদ আর রাজনীতি নিয়ে মত দিইনি। তারপরই সমস্যা শুরু!'
এই শেষ কথাটাই সারসত্য! মত দিতে পারে না প্রান্তিক মানুষ। রাজনীতি নিয়ে অবস্থান জানানোর হক নেই তার। মাথায় রাখা যায় তাকে—কিন্তু মাথা তোলার অধিকার? উঁহু, নৈব নৈব চ!
বাংলায় চোস্ত ইংরেজিতে কথা বলা 'নাগরিকে'র অভাব নেই। কলকাতার ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের ছাত্রছাত্রী, যাদবপুরের ক্লাসরুম, প্রেসিডেন্সির করিডর—সর্বত্র ইংরেজিতে সিনেমা নিয়ে, বই নিয়ে আলোচনা জমে। সেই ইংরেজি 'শুদ্ধ', 'পরিশীলিত', 'গ্রহণযোগ্য'। কিন্তু পূজারিণীর ইংরেজি 'ভুল'। উচ্চারণে গ্রাম্য টান। আভিধানিক অধিকার নেই… অনেক সময় শব্দ খুঁজতে হয়। কখনও বাক্য হোঁচট খায়।
যারা এই অভিযোগ তুলছেন, তাঁরা ভুলে যান, এই 'ভুল' ইংরেজিই পূজাকে কোটি মানুষের দরবারে পৌঁছে দিয়েছে। কারণ ওই টান, ওই থমকানো, ওই হাতড়ানো— এগুলোর সঙ্গে তাঁদের নিজেদেরও লড়ে যেতে হয়। ভারতের বিশাল অংশ, যাঁরা মসৃণভাবে ইংরেজিতে কথা বলতে চান কিন্তু পারেন না—তাঁরা পূজারিণীর মধ্যে নিজেদের দেখছেন। দেখার 'অনুমতি' পেয়েছেন। কিন্তু ভাষার পাহারাদাররা এই অনুমোদনে রাজি নন।
এখানে সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য উল্লেখ করা জরুরি। সাহিত্যিক সঙ্গীতা ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, পূজারিণীর ইংরেজি শুনলে তাঁর 'মাথা ধরে যায়'। বলেছেন, 'শব্দের dust ভেতরে settle করার আগেই আলোচনা করা হয়ে যাচ্ছে!' পড়া ও দেখার পর 'উপলব্ধির নীরব অধ্যায়' জরুরি। সেটা পূজারিণীর কাজে নেই।
কথাগুলো লক্ষ্যণীয়। পালটা প্রশ্ন উঠবে—পূজারিণীর পাঠাভ্যাসের তরলতার খোঁজ সঙ্গীতা পেলেন কীভাবে? বিনা প্রমাণে এত বড় কথা বলাটা কতখানি সঙ্গত? তা ছাড়া রিল সাধারণত কয়েক সেকেন্ড কিংবা মিনিটের হয়। এখানে বিস্তারে নিবিড় বিশ্লেষণের জায়গা নেই। একজন যে মানুষ আজীবন অনেক কিছু পড়ার ইচ্ছে থাকলেও সুযোগ পাননি, স্কুলের বাইরে সাহিত্যের আলোচনা শোনেননি, ঘরে বইয়ের আলমারি ছিল না—তিনি যখন প্রথম বই হাতে তুলে উত্তেজনায় স্রেফ 'ভাল লাগা-মন্দ লাগা'টুকু বলতে উৎসুক, সেটাও কি সঙ্গীতা-কথিত 'নীরব উপলব্ধি'র নিয়ম মেনে চলতে বাধ্য?
এই প্রসঙ্গে, রবীন্দ্রনাথের 'সাহিত্যবিচার' প্রবন্ধের একটি অংশ উদ্ধৃত করার লোভ সামলানো গেল না। আশা করি, এরপর এই প্রসঙ্গে বিস্তারে পাল্টা মত দেওয়াটাও বাতুলতা ঠেকবে। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, 'আমাদের দেশের সাহিত্যবিচারে ব্যক্তির পরিচয় বাদ দিয়ে শ্রেণীর পরিচয়ের দিকেই ঝোঁক দেওয়া হয়।… বাংলাসাহিত্যের অন্তঃপুরে শ্রেণীর যাচনদার বাহির হতে ঢুকে পড়েছে; কেউ তাদের দ্বাররোধ করবার নেই। বাউলকবি দুঃখ ক'রে বলেছে, ফুলের বনে জহুরী ঢুকেছে, সে পদ্মফুলকে নিকষে ঘষে ঘষে বেড়ায়, ফুলকে দেয় লজ্জা।'
ভাষা ছাড়িয়ে সঙ্গীতার বড় আক্রমণ পূজারিণীর 'সিম্পলিসিটি'র বিরুদ্ধে। তাঁর বক্তব্য—শিল্প, সাহিত্য, জ্ঞান—এসবের সঙ্গে সরলতার কোনও সম্পর্ক নেই। কিন্তু প্রশ্ন হল—সরল ভাষায় কথা বললেই কি ভাবনা তরল হয়ে যায়? 'খাপছাড়া'র রবীন্দ্রনাথ লিখছেন 'সহজ কথায় লিখতে আমায় কহ যে,/ সহজ কথা যায় না লেখা সহজে।' কিংবা ঈশ্বর গুপ্ত যখন 'বেদান্তগ্রন্থ', 'বেদান্তসার' কিংবা কঠোপনিষৎ'-এর লেখক রাজা রামমোহন রায় সম্পর্কে লেখেন, 'দেওয়ানজী জলের ন্যায় সহজ ভাষা লিখিতেন…' তখন সঙ্গীতার অভিযোগের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বভাবিক। কিছুদিন আগে রণবীর চক্রবর্তীর একটি সেমিনার দেখছিলাম, ইউটিউবে। সেখানে তিনি অধ্যাপক অশীন দাশগুপ্ত প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে জানান, তিনি (অশীনবাবু) খুব 'জটিল' কথাও 'সহজে' বলতে পারতেন! বাকি আর কী বলেছিলেন রণবীর, এই প্রসঙ্গে সেটা অপ্রাসঙ্গিক।
শুধু এটুকু উল্লেখ করার কারণ, আমরা ভাষার জটিলতাকে 'গভীরতা' ভেবে নিই। হয়তো তাই 'পথের পাঁচালী'র ভাষাও আমাদের কাছে 'সহজ'। তা কেবলই প্রকৃতির মরসুমি কার্নিভাল। আড়ালে লুকিয়ে থাকার ক্ষুধার রাজনীতি… ক'জনকে স্পর্শ করেছে? পূজারিণীর 'সহজ' চালও এ কারণেই সঙ্গীতার মতো কারও কারো কাছে 'হালকা' ঠেকেছে। এটা তাঁর সীমাবদ্ধতা, নাকি সমালোচকদের দৃষ্টিভঙ্গির? আরও বড় প্রশ্ন—একজন মানুষ বই পড়ে, নিজের মতো করে ভাবনা প্রকাশ করছেন—সেটাকে এক নিমেষে 'ট্র্যাশ' বলে দেগে দেওয়াটা কি নিজেই এক ধরনের নিন্দনীয় এলিটিজম নয়?
সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও বলেছেন, 'চর্চার মধ্যে থাকা পাঠক' সোশ্যাল মিডিয়ার সাহিত্যকে গ্রহণ করেননি। সেগুলো 'B grade, C grade'-এর বাইরে যেতে পারেনি। প্রশ্ন হল—'চর্চার মধ্যে থাকা পাঠক' মানে কারা? সাহিত্য একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্তদের পাঠক? বিশেষ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রী? নির্দিষ্ট প্রকাশনা থেকে বের হওয়া বইয়ের ক্রেতা?
যদি তাই হয়, তাহলে মানের সংজ্ঞাটা নির্ধারিত হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির রুচির মাপকাঠিতে। সেই মাপকাঠির বাইরে যা কিছু—তা গ্রেড বি, সি। এই যুক্তি বিপজ্জনক। কারণ এভাবে দেখলে রবীন্দ্রনাথের আগে বাংলা সাহিত্যের বিশাল অংশ—পাঁচালি, কীর্তন, পুথি—'গ্রেড সি' হয়ে যায়। কারণ সেগুলো 'চর্চার বাইরের' মানুষেরা পড়তেন, শুনতেন। হয়তো তাই মান স্থায়ী নয়। মানদণ্ড তৈরি হয় ক্ষমতার নিরিখে। কারা ঠিক করবেন কোনটা সাদা, কোনটা কালো—সেটা নিরপেক্ষ প্রশ্ন নয়। সেখানে শ্রেণি, জাত, ভাষার আধিপত্যও মিশে থাকে।
গায়িকা পরমা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি আক্রমণে যাননি। প্রস্তাব দিয়েছেন—লাইভ প্রশ্নোত্তর হোক। পূজারিণীকে সামনে বসিয়ে! তাহলে নাকি বিতর্ক মিটবে। কিন্তু এই প্রস্তাবে অনুমানের আড়ালে সুপ্ত বিষ মিশে রয়েছে। অনুমানটা হল—পূজারিণী যদি 'আসলে' সিনেমা-সাহিত্য নিয়ে কিছু জানেন-টানেন, তাহলে প্রমাণ করতে পারবেন। আর যদি না পারেন, তাহলে বোঝা যাবে তিনি 'ভুয়ো'।
পরমার তাঁর প্রস্তাবে অনেক কিছু স্পষ্ট করেননি। যেমন, পরীক্ষার মঞ্চটা কে তৈরি করবেন? বাছাই 'অডিয়েন্স' কারা হবেন? কে ঠিক করবেন প্রশ্নের মান? যিনি নিজে থেকে পড়েছেন, নিজের আনন্দে কথা বলেছেন—তাঁকে 'পরীক্ষায়' বসতে হবেই বা কেন? সিনেমা ভালো লেগেছে বলে কথা বলার জন্য কি সিনেমার ডিগ্রি লাগে? বই ভাল লেগেছে বলে কথা বলার জন্য কি ভাষা ও সাহিত্যের স্নাতক হতে হয়? শহুরে ইনফ্লুয়েন্সারদেরও কি এভাবে অগ্নিপরীক্ষায় নামতে হয়? পরমার প্রস্তাব উপরে উপর যুক্তিসঙ্গত। কিন্তু গভীরে একটা দরজা বন্ধ রাখার নিদারুণ প্রচেষ্টা। যে দরজার গায়ে লেখা—'কথা বলতে হলে আগে যোগ্যতা প্রমাণ করো!'
পুরো বিতর্কে পূজারিণী প্রধান একটাই কথা বলেছেন বারবার—আমি নিখাদ সত্যি। আমার মত আমার। স্বীকার করেছেন, এজেন্সি আছে। কিন্তু কন্টেন্ট তাঁর নিজের। টাকা আসছে। কিন্তু কথাগুলো কারও তর্জনী মেনে চলে না।
কৈফিয়ত বিশ্বাস করা বা না করা যার যার নিজের ব্যাপার। কিন্তু একটা কথা অস্বীকারের জায়গা নেই—পূজারিণী যখন বললেন, 'ওরা চায় আমি কষ্টের কথা বলি, দুঃখের কথা বলি, অভাবের কথা বলি। কিন্তু যখন রোজগার শুরু হল, মত দেওয়া শুরু হল—তখনই সমস্যা শুরু!'—এর চাইতে সত্য কিছু হতে পারে না। প্রান্তিক মানুষ কাঁদতে পারেন—সেটা 'অনুপ্রেরণা'। হাসতে পারেন—সেটা 'আশার গল্প'। কিন্তু মত দিতে গেলেই সন্দেহ। কারণ মত দেওয়ার অধিকার—সেটা এখনও 'ওদের' জন্য খোলেনি।
এই গোটা বিতর্কে আসলে বেরিয়ে পড়েছে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়ার শ্রেণিবিভাজন, ভাষার রাজনীতি, 'অথেন্টিসিটি'র দ্বৈত মাপকাঠি। বেরিয়ে পড়েছে কারা কথা বলতে পারেন, কোন উচ্চারণে বলতে পারেন, কতটুকু বলতে পারেন-সংক্রান্ত নোংরা ছাঁকনিটুকু।
পূজারিণী প্রধান দিনের শেষে একটা আয়না। যে আয়নায় দ্বিধাতুর, খণ্ডিত, হতাশামগ্ন, সর্বার্থে ফাঁপা মধ্যবিত্ত বাঙালি নিজের মুখ দেখছে এবং সহ্য করতে পারছে না।

