শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়
'দেবী চৌধুরাণী'-র নাম শুনলেই ভেসে ওঠে একটাই মুখ সামনে, তিনি সুচিত্রা সেন। কিন্তু আরও এক কিংবদন্তি অপ্সরা নায়িকা দেবী চৌধুরাণী রূপে বাংলা চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন, অথচ 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে তিনি আজ বিস্মৃত। সেই অভিনেত্রীর নাম সুমিত্রা দেবী। ঠিক সুচিত্রা সেনের অগ্রজা নায়িকা।সুমিত্রা দেবীর গ্ল্যামারের ছটা ছড়িয়ে পড়েছিল টালিগঞ্জ পাড়া থেকে আরব সাগরের পাড়ে। বোম্বেতেও তিনি নিজের কাজের নজির রেখেছিলেন। সুমিত্রা দেবীর প্রতিমা-মুখ বোম্বের ফিল্মফেয়ার পত্রিকার প্রচ্ছদেও জায়গা করে নিয়েছিল। অথচ তিনিও যে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তা আজ একেবারেই কেউ জানেননা।
সুমিত্রা দেবী সবথেকে বেশি যে চরিত্র দিয়ে স্মরণীয় তা হল 'সাহেব বিবি গোলাম'-এর পটেশ্বরী ছোটো বৌঠান। সঙ্গে ভূতনাথ চরিত্রে উত্তম কুমার। যদিও বঙ্কিম-কাহিনি নিয়ে প্রথম 'দেবী চৌধুরাণী' নির্বাক ছবি হয় ১৯৩১ সালে। পরিচালক প্রিয়নাথ গঙ্গোপাধ্যায়। দেবীর নামভূমিকায় অনুপমা দেবী।
১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল মুক্তি পেয়েছিল দ্বিতীয়বার বাংলা ছবি 'দেবী চৌধুরাণী'। কাহিনি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। প্রফুল্ল ওরফে দেবী চৌধুরাণীর নামভূমিকায় সুমিত্রা দেবী এবং নায়ক ব্রজেশ্বরের ভূমিকায় প্রদীপ কুমার।প্রদীপ কুমারের আসল নাম শীতল বটব্যাল। চলচ্চিত্র দুনিয়ায় এসে হন প্রদীপ কুমার। 'অলকানন্দা', 'বার্মার পথে', 'দস্যু মোহন', 'আনন্দমঠ' প্রভৃতি ছবি দিয়ে যিনি শুরু করেন তাঁর স্বর্ণোজ্জ্বল ফিল্ম-ক্যারিয়ার। বোম্বেতেও সফল হিরো তিনি। সতীশ দাশগুপ্ত পরিচালিত 'দেবী চৌধুরাণী' ছবিটি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৪৯ সালের ২৯ এপ্রিল কলকাতার 'বীণা' ও 'বসুশ্রী' প্রেক্ষাগৃহে। রবিপ্রসাদ গুপ্ত ও ইন্দ্রজিত্ সিংহ প্রযোজিত এই 'দেবী চৌধুরাণী' ছবির রূপায়ণে ছিলেন
সুমিত্রা দেবী, প্রদীপ কুমার, ছবি বিশ্বাস (সাহেব চরিত্রে), নীতিশ মুখোপাধ্যায়, উত্পল সেন, উপেন চট্টোপাধ্যায়, রেবা বসু, সুদীপ্তা রায়, উমা গোয়েঙ্কা, লীলাবতী করালী, নিভাননী, ফণি রায়, স্বাগতা চক্রবর্তী, মনোরমা, ঊষা, নৃপতি চট্টোপাধ্যায়, প্রভা দেবী, তুলসী চক্রবর্তী, হারু ঘোষ প্রমুখ। ছবির সুরকার ছিলেন কালীপদ সেন। এই ছবিতে গানের কথা লিখেছিলেন 'মুক্তির মন্দির সোপান তলে' গানের গীতিকার মোহিনী চৌধুরী। দেবী চৌধুরাণীর জন্য মোহিনী চৌধুরী লিখলেন
'কেন তুই সব হারিয়ে সাজলি কাঙাল,
সব আছেরে তোর,
যদি হায় বুক ভেঙে যায় দুঃখের ঘায়ে
রাখিস মনের জোর।' গীতিকার বিমলচন্দ্র ঘোষও কয়েকটি গান লিখেছিলেন ছবিতে। যেমন দেবী চৌধুরাণীর মহিমা নিয়ে তিনি লিখলেন
' জয় হে, জয় হে, জয় জয় জয়, তব জয়হে!
তুমি হে দয়াময়ী বরাভয়দাত্রী,
দুর্গত জনগণ ভাগ্যবিধাত্রী
শত্রু বিমর্দ্দিনী হে জগদ্ধাত্রী
জয় জয় জয় জয় তব, জয়হে জয়হে।
মানবী রূপে তুমি দেবী মহাশক্তি,
দুর্বলে বল দাও, দুর্জনে ভক্তি,
কল্যাণদায়িনী মূর্ত প্রশান্তি।' তত্কালীন সিনে পত্রিকায় এই 'দেবী চৌধুরানী' ছবি সম্পর্কে লেখা হয়েছিল 'সতীশ দাশগুপ্ত পরিচালিত ছবিখানি মোটামুটিভাবে রসোত্তীর্ণ হয়েছে। ছবিতে দেবী চৌধুরাণীর ভূমিকায় সুমিত্রা দেবী এবং ব্রজেশ্বরের ভূমিকায় প্রদীপ কুমার ভাল অভিনয় করেছেন। অন্যান্য ভূমিকাগুলিও ছিল যথাযথ। ক্যামেরা ও ছবির অন্যান্য দিকগুলি নিন্দনীয় নয়। ছবিখানি দর্শকদের কাছেও উপভোগ্য হয়েছে।' সুমিত্রা দেবী ও প্রদীপ কুমার জুটি হিসেবে ভীষণভাবে সুপারহিট জুটি ছিলেন ঐ সময়ে এবং প্রফুল্ল ও ব্রজেশ্বরের চরিত্র-চিত্রণে দুজনেই ছিলেন যথাযথ। যে রোম্যান্টিক আবেদনটা একেবারেই ক্লিক করেনি পরবর্তী 'দেবী চৌধুরাণী' সুচিত্রা সেন ও রঞ্জিত মল্লিকের জুটির মধ্যে। ব্রজেশ্বর প্রদীপ কুমার ও প্রফুল্ল সুমিত্রা দেবী দীনেন গুপ্ত তৃতীয়বার 'দেবী চৌধুরাণী' ছবি নির্মাণ করেছিলেন ১৯৭৪ সালে। সেই ছবিতে অভিনয় করেছিলেন রঞ্জিত মল্লিক, সুচিত্রা সেন, বসন্ত চৌধুরী, কালী ব্যানার্জি, হারাধন ব্যানার্জি, পদ্মা দেবী, সুমিত্রা মুখার্জী, ছায়া দেবী, শেখর চ্যাটার্জী প্রমুখ।
এই ছবিটি মুক্তির পরে সমালোচনায় লেখা হয়েছিল-
'দীনেন গুপ্তের দেবী চৌধুরাণী ছবিখানি সব দিকে থেকেই একটি ব্যর্থ চিত্ররূপ। বিশেষকরে ব্রজেশ্বরের ভূমিকায় রঞ্জিত মল্লিক এবং দেবী চৌধুরানীর ভূমিকায় সুচিত্রা সেনের মধ্যে বয়সের ফারাকটা বড় বেশি চোখে পড়ে। মা ছেলের ছবি।' সুচিত্রা সেন-রঞ্জিত মল্লিক, প্রফুল্ল-ব্রজেশ্বর যদিও 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে সুচিত্রা সেনের ব্যক্তিত্ব ও দাপট অস্বীকার করা যায়না। সুচিত্রার ছবিটি বক্সঅফিসে হিট করেছিল এবং সেটা শুধুমাত্র সুচিত্রা সেন ছিলেন বলেই। সেই গঙ্গাবক্ষে বজরার ছাদে বসে বীণা বাজিয়ে সুচিত্রা সেন গাইছেন আপন প্রিয়তমের প্রতি 'এসো হে আমার রাজাধিরাজ' আর দেবীর বেনারসির ঘোমটা পালের মতোই উড়ছে, পেছনে ভরা পূর্ণিমার আলো। এইসব দৃশ্যে আইকনিক হয়ে আছেন সুচিত্রা সেন। ভবানী পাঠক ও দেবী সত্যজিত্ রায় যখন ষাটের দশকে সুচিত্রা সেনকে নিয়ে 'দেবী চৌধুরাণী' করবেন বলে মনস্থির করেন তখন থেকেই সুচিত্রাময় হয়ে ওঠে দেবী অর্থাত্ প্রফুল্ল চরিত্রটি। যদিও সে ছবি বাস্তবায়িত হয়না সুচিত্রা-সত্যজিত্ মতবিরোধে। পরে দীনেন গুপ্ত করলেন সুচিত্রা সেনকে নিয়ে 'দেবী চৌধুরাণী', কিন্তু সেই ছবিতে সত্যজিত্ রায়ের সুচিত্রা সেনকে দেখার সাধ মিটলনা দর্শকের। এইসব বিতর্কের মাঝেও আজও দর্শকের মনে 'দেবী চৌধুরাণী' রূপেই শুধুই সুচিত্রা। অথচ সেই চল্লিশের দশকে শেষে 'দেবী চৌধুরাণী' রূপে অভিনয় করে ফেলেছেন আরেক প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী সুমিত্রা দেবী। যেখানে সেই ছবিটিও প্রশংসিত। অথচ ছবিটি সে অর্থে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছোয়নি বলে দেবী চৌধুরাণী রূপে সুমিত্রা দেবী একালে আর স্বীকৃতি পাননি। ছবিটি পাওয়াও অপ্রতুল। ছবিটাই আজ মানুষের মনে বিস্মৃত।
'দেবী চৌধুরাণী' সুমিত্রা দেবীর ইমেজ হারিয়ে গেল 'কিনু গোয়ালার গলি'তে। *সুমিত্রা দেবীর 'দেবী চৌধুরাণী' ছায়াছবির বুকলেট সৌজন্যে - ডঃ জ্যোতিপ্রকাশ গুহ।

