দ্য ওয়াল ব্যুরো: শেষ বাঁশি বাজতেই ডালাসের ময়দান সাক্ষী থাকল এক আবেগঘন ও প্রতীকী মুহূর্তের। আবেগঘন… কারণ, স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে মাঠেই কান্নায় ভেঙে পড়েন পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো (Cristiano Ronaldo World Cup Exit)। আর যখন কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার আনন্দে মাতোয়ারা স্পেনের ফুটবলাররা, ঠিক তখনই এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখল গোটা দুনিয়া।
দলের বাঁধভাঙা উৎসব উদযাপন মাঝপথে থামিয়ে এগিয়ে এলেন স্পেনের ১৮ বছর বয়সি তরুণ তুর্কি লামিন ইয়ামাল। ৪১ বছরের বিধ্বস্ত আল নাসর তারকাকে পরম শ্রদ্ধায় বুকে টেনে নিলেন বার্সেলোনার এই বিস্ময় বালক (Lamine Yamal Consoles Ronaldo)।
মুহূর্তটি প্রতীকী। কারণ, একদিকে কেরিয়ারের অস্তাচলে সিআরসেভেন। অন্যদিকে সদ্য মহাতারকা হয়ে উঠছেন ইয়ামাল। এক অর্থে, এই জড়িয়ে ধরা যেন দুই প্রাজন্মের অব্যক্ত সংলাপ। একদিকে অপসৃত হচ্ছে পর্তুগিজ মহাতারকার বিচ্ছুরণ। অন্যদিকে ধীরে ধীরে আভা ছড়াচ্ছেন স্পেনের প্রতিভা।
সব মিলিয়ে মিকেল মেরিনোর ইনজুরি টাইমের গোল পর্তুগালের বিশ্বজয়ের স্বপ্ন চুরমার করে দেওয়ার পর, দুই প্রজন্মের এই মেলবন্ধনের ছবি মুহূর্তের মধ্যে নেটদুনিয়ায় ভাইরাল। কেরিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলে মাঠ ছাড়ার সময় রোনাল্ডোর অসহায়তা ছুঁয়ে গেছে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী শিবিরের এই তরুণকেও।
ছিটকে যাওয়ার যন্ত্রণা
এই ম্যাচটিকে ফুটবলবিশ্ব মূলত দুই প্রজন্মের মহাসংগ্রাম হিসেবেই দেখছিল (Spain vs Portugal Match Analysis)। পর্তুগালের হয়ে পুরো ৯০ মিনিট জুড়েই ময়দানে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা রোনাল্ডো। কিন্তু স্পেনের জমাট ও নিশ্ছিদ্র রক্ষণের বিরুদ্ধে তেমন কোনও প্রভাবই ফেলতে পারেননি (FIFA World Cup 2026 Round of 16)। প্রথমার্ধে তাঁর নেওয়া একটি চমৎকার শট স্প্যানিশ গোলরক্ষক উনাই সিমন দারুণ দক্ষতায় বাঁচান। এরপর অতিরিক্ত সময়ে মেরিনো গোল করতেই পর্তুগালের সমতা ফেরানোর সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়।
২০১৬ সালের ইউরো কাপের পর ২০১৯ এবং ২০২৫ সালে উয়েফা নেশনস লিগ জেতা রোনাল্ডোর ট্রফি ক্যাবিনেটে অধরা থেকে গেল এই বিশ্বকাপ ট্রফি!
অবসরের জল্পনা ও বিবেকের আয়না
ম্যাচ শেষে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রোনাল্ডো স্বীকার করেন, বিদায় মেনে নেওয়াটা ভীষণ কঠিন। তবে আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে এখনই বুটজোড়া তুলে রাখার মতো কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নিতে নারাজ তিনি। সিআরসেভেন বলেন, 'এভাবে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেওয়ায় দুঃখিত। আমি আমার সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি। নিজের সেরাটা দিয়েছি এবং পরিষ্কার বিবেক নিয়েই ফিরছি। হ্যাঁ, এটা আমার শেষ বিশ্বকাপ ছিল ঠিকই, কিন্তু এখন আমার হাতে ভাবার সময় আছে। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাব। আমি কোনও হঠকারী সিদ্ধান্ত নেব না!'
৪১ বছর বয়সি এই তারকা আরও যোগ করেন, পরাজয়ের উত্তেজনার বশে কোনও বড় পদক্ষেপগ্রহণ, যাতে দলের উপর এর কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তাঁর তীব্র অপছন্দ।
পর্তুগিজ ফুটবল ইতিহাস ও কোচের বিদায়
নিজের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারের সাফল্য নিয়ে বলার সময় পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসকেও মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি রোনাল্ডো। খানিক দম্ভের সুরেই বলেন, 'আমি পর্তুগালের হয়ে তিনটে ট্রফি জিতেছি। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর আগে পর্তুগাল একটাও ট্রফি জেতেনি। জাতীয় দলের জেতা সবচেয়ে বড় ট্রফি হল ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ, যা সত্যি কথা বলতে আমার কাছে একটা বিশ্বকাপের মতোই তাৎপর্যপূর্ণ।'
এই লজ্জাজনক হারের পর দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দিয়েছেন পর্তুগালের কোচ রবার্তো মার্তিনেজ। বিদায়ী কোচকে ধন্যবাদ জানিয়ে রোনাল্ডো বলেন, 'আমি ওঁর সঙ্গে কাজ করতে খুব পছন্দ করতাম। একজন দারুণ ম্যানেজার এবং খুব ভাল মানুষ। পর্তুগালের জন্য উনি যা করেছেন, তার প্রশংসা করতেই হবে। আমি ওঁকে ধন্যবাদ জানাই, ওঁর মঙ্গল কামনা করি।'

