দ্য ওয়াল ব্যুরো: রেফারির শেষ বাঁশি বাজার পর কোমরে হাত দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর চোখের জল স্পষ্ট বুঝিয়ে দিচ্ছিল, তাঁর বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন চিরতরে শেষ।
আসলে এই বিদায়বেলার স্ক্রিপ্ট চার বছর আগে কাতারেই লেখা হয়ে গিয়েছিল, যখন মরক্কোর কাছে হেরে শেষ আট থেকে ছিটকে যায় পর্তুগাল।
কিন্তু ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে বিদায়ী সফরের আশায় এগিয়ে চলে রোনাল্ডোর রথ (World Cup 2026)। স্পেনের বিরুদ্ধে ৪১ বছরের এক কিংবদন্তিকে দেখে অনুরাগীরা আবারও হতাশ, যিনি কালের নিয়মকে হার মানাতে গিয়ে নিজেই মুখ থুবড়ে পড়েছেন।
পুরো ম্যাচে বল ছুঁয়েছেন মাত্র ১৯ বার। স্পেনের স্ট্রাইকার মিকেল ওয়ারসাবাল তাঁর থেকে অনেকটা এগিয়ে। সাকুল্যে ৩৫ বার বল ছুঁয়েছেন। উজবেকিস্তানের বিরুদ্ধে দু'টি গোলের পর ক্যামেরার সামনে 'আমি ফিরে এসেছি' বলে যে দর্পিত হুঙ্কার ছুড়েছিলেন, তা আসলে মরীচিকা ছাড়া কিছুই ছিল না, এতক্ষণে প্রমাণিত। ডালাসের মাঠে ক্ষয়িষ্ণু মহাতারকার স্রেফ দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকাটাও তাই প্রতীকী (Spain vs Portugal)।
মার্তিনেজের মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয় ও ছন্নছাড়া ফুটবল
আগের কোচ ফার্নান্দো স্যান্টোস কাতার বিশ্বকাপে রোনাল্ডোকে প্রথম একাদশের বাইরে রাখার সাহস দেখান। কিন্তু রবার্তো মার্তিনেজ তাঁকে কার্যত মাথায় তুলে রেখেছিলেন। স্পেনের বিরুদ্ধে গোলশূন্য অবস্থায় যখন পর্তুগালের আক্রমণে ধার বাড়ানো জরুরি, তখন ময়দান ছাড়েন পেদ্রো নেতো, ভিতিনিয়া, জোয়াও ফেলিক্স এবং জোয়াও ক্যানসেলো। কিন্তু মাঠের সবচেয়ে বয়স্ক খেলোয়াড় রোনাল্ডোকে শেষ পর্যন্ত রেখে দেন (Cristiano Ronaldo) মার্তিনেজ।
এই প্রথম নয়। টুর্নামেন্টের গ্রুপ পর্বেও তিনি দলের অন্য যে কোনও খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি মিনিট ময়দানে। ক্রোয়েশিয়ার বিরুদ্ধে আগের ম্যাচে রোনাল্ডোকে তুলে গঞ্জালো রামোসকে নামানোর সুবাদেই আসে কাঙ্ক্ষিত জয়। লড়াই শেষে রামোস বলেন, 'শেষ মুহূর্তে গোলের দরকার হলে গঞ্জালো রামোসকে ডাকতে পারেন!' অদ্ভুতভাবে, স্পেনের বিরুদ্ধে সেই নম্বরটি আর ডায়াল করার সাহস দেখাননি মার্তিনেজ। ফলস্বরূপ, ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা পিএসজি-র তারকা মিডফিল্ডার ভিতিনিয়ার মতো প্রতিভাবান খেলোয়াড়রা নিজেদের নামের প্রতি সুবিচারে ব্যর্থ। পর্তুগালকে দেখে আর কিছু নয়… একটি চরম ছন্নছাড়া ও অগোছালো দল মনে হয়েছে!
দলের স্বার্থের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিগত রেকর্ড ছোঁয়ার জেদ
পর্তুগিজ ফুটবলে রোনাল্ডোর অবদান অনস্বীকার্য। ২৩৩টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে ১৪৬টি গোল এবং পাঁচটি ব্যালন ডি'অর জয়ী এই মহাতারকার আসন ফুটবলের ইতিহাসে চিরস্থায়ী। ছ'টি বিশ্বকাপে গোল করার অনন্য নজির গড়েছেন। ইউসেবিওকে টপকে দেশের হয়ে বিশ্বকাপে হয়েছেন সর্বোচ্চ গোলদাতা (FIFA World Cup 2026)।
কিন্তু প্রশ্ন হল, তাঁর এই ব্যক্তিগত মাইলফলকগুলো পর্তুগাল টিমকে ঠিক কতটা সাহায্য করল? অনেকের মতে, এবারের বিশ্বকাপ রোনাল্ডোর কাছে দলের সাফল্যের চেয়ে তাঁর ব্যক্তিগত জেদপূরণের একার লড়াই হয়ে দাঁড়ায়। ডিআর কঙ্গোর বিরুদ্ধে খারাপ খেলা বা কলম্বিয়ার বিরুদ্ধে কোনওরকমে হার বাঁচানো পর্তুগাল দলের ব্যর্থতা অনেক গভীর। কোচের পদত্যাগের পর এখন সেই ব্যর্থতার ময়নাতদন্ত শুরু হলেও, এটা স্পষ্ট, যে দলে রোনাল্ডোর অতিরিক্ত উপস্থিতি এবং তাঁকে কেন্দ্র করে আবর্তিত রণনীতি দলের স্বাভাবিক ছন্দকে নষ্ট করেছে (Portugal Football Team)।
আক্ষেপ ঢাকতে সাফাই এবং 'স্বচ্ছ বিবেকে'র দাবি
নিজের পড়তি ফর্ম এবং দলের এই করুণ পরিণতির আঁচ রোনাল্ডো হয়তো আগই পেয়েছিলেন। তাই ম্যাচের আগের দিনই তিনি সমালোচকদের একহাত নেন এবং পরের দিন মিক্সড জোনে এসে সাংবাদিকদের সামনে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেন। বিশ্বকাপ না পাওয়ার আক্ষেপ ঢাকতে তাঁর দাবি, 'আমার মতে, জাতীয় দলের জেতা সবচেয়ে বড় ট্রফি হল ২০১৬ সালের ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। আমি আন্তরিকভাবে মনে করি, এর গুরুত্ব বিশ্বকাপের সমান!'
বিদায়বেলায় নিজের ভূমিকার সাফাই গেয়ে রোনাল্ডো আরও বলেন, 'আমি সবটুকু উজাড় করে দিয়েছি, তাই আমার বিবেক একেবারে পরিষ্কার—ব্যাস, এটুকুই। কাল একটা নতুন দিন আসবে এবং জীবন নিজের নিয়মেই এগিয়ে যাবে।'অর্থাৎ, দল হারল। প্রতিভাবান স্কোয়াড নিয়েও ফের একবার বিশ্বমঞ্চ থেকে খালিহাতে ফিরল পর্তুগাল। তবু ব্যর্থতার যাবতীয় দায় এড়াতে রোনাল্ডো নিজের ইগোর মোড়কেই নিজেকে সুরক্ষিত রাখার শেষ আপ্রাণ চেষ্টাটুকু চালিয়ে গেলেন।

