রাজ্যপালের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পর আর একবারও লোকভবনে যাননি। আজ বিকেল তিনটে নাগাদ কলকাতা ছেড়ে কেরলের উদ্দেশ্যে রওনা দেবেন বিদায়ী রাজ্যপাল ডঃ সি ভি আনন্দ বোস। তার আগে বাংলার মানুষের উদ্দেশে একটি আবেগঘন খোলা চিঠি লিখলেন তিনি। সেই চিঠিতে গত তিন বছরে বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে মানুষের সঙ্গে তাঁর অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেছেন।
চিঠির বিভিন্ন অংশে রয়েছে মহাত্মা গান্ধি ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উদ্ধৃতি, যা তাঁর বক্তব্যকে আরও গভীরতা দিয়েছে।
"মেয়াদ শেষ হলেও বাংলার সঙ্গে সম্পর্ক শেষ নয়"
রাজ্যবাসীর উদ্দেশে লেখা চিঠিতে সিভি আনন্দ বোস স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, রাজ্যপালের পদে তাঁর মেয়াদ শেষ হলেও বাংলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়নি।
তিনি লিখেছেন, "রাজ্যপাল হিসেবে আমার মেয়াদ শেষ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে আমার যাত্রা এখানেই শেষ নয়। আমার দ্বিতীয় বাড়ি পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই যুক্ত থাকব।" তিনি আরও বলেন, কলকাতার লোকভবনে তাঁর দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হলেও বাংলার মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও সমর্থনের জন্য তিনি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ।
বাংলার মানুষের ভালবাসার স্মৃতি তুলে ধরলেন বোস
চিঠিতে বাংলার মানুষের সঙ্গে কাটানো নানা স্মৃতির কথা উল্লেখ করেছেন বিদায়ী রাজ্যপাল। তাঁর কথায়, গত তিন বছরে রাজ্যের নানা প্রান্তে ঘুরে মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশতে পেরেছেন তিনি। তিনি লিখেছেন, "আমার প্রিয় বাংলার ভাই ও বোনেরা, লোকভবনে আমার দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হওয়ার এই মুহূর্তে আপনাদের সমর্থন ও স্নেহের জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। আমাদের প্রিয় রাজ্যের স্নেহশীল মানুষের আলিঙ্গনে কাটানো মুহূর্তগুলো আমি চিরকাল মনে রাখব।"
Exclusive C. V. Ananda Bose: 'আমার বিবেক আমাকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেছে', বিস্ফোরক রাজ্যের বিদায়ী রাজ্যপাল
চিঠিতে তিনি আবেগঘনভাবে উল্লেখ করেন-
একজন বোনের আলিঙ্গন, একটি ছোট্ট ছেলের পিঠে চাপড়, এক তরুণের দৃঢ় করমর্দন কিংবা দূর থেকে হাত তুলে দেওয়া শুভেচ্ছার কথা এখনও তাঁর মনে গেঁথে রয়েছে। "বাংলার অলি-গলিতে মানুষের মধ্যেই ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছি" বিদায়ী রাজ্যপাল তাঁর চিঠিতে বাংলার মানুষের মধ্যেই মানবতার শক্তি দেখার অভিজ্ঞতার কথাও তুলে ধরেছেন।
তিনি লিখেছেন, "আমি ঈশ্বরকে খুঁজতে চেয়েছিলাম। কলকাতার অলি-গলি, গ্রাম ও শহরের রাস্তায়, শিশুদের উজ্জ্বল চোখে এবং প্রবীণদের স্নেহপূর্ণ দৃষ্টিতে আমি ঈশ্বরকে খুঁজে পেয়েছি।"
গত তিন বছরে তিনি রাজ্যের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ জুড়ে ভ্রমণ করেছেন, মানুষের সঙ্গে কথা বলেছেন, গ্রামাঞ্চলের সাধারণ মানুষের সঙ্গে বসে খাবার ভাগ করেছেন এবং তরুণ গবেষক ও শিক্ষাবিদদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন বলেও জানান।
প্রাক্তন রাজ্যপাল বোসের কথায়, বাংলার সমাজজীবনের মধ্যে যে আত্মমর্যাদা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, তা বাংলার মানসিকতার শক্তিকেই তুলে ধরে। এরপর মহাত্মা গান্ধির উদ্ধৃতি টেনে আবেগঘন বার্তা চিঠিতে মহাত্মা গান্ধির একটি বিখ্যাত মন্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন বিদায়ী রাজ্যপাল।
তিনি লেখেন, "কয়েক দশক আগে মহাত্মা গান্ধি বলেছিলেন- আমি বাংলা ছেড়ে যেতে পারছি না এবং বাংলা আমাকে যেতে দেবে না। আজ আমি সেই অনুভূতিই ভাগ করে নিচ্ছি।"
তিনি আরও বলেন, বাংলার মাটি এমন এক শক্তিশালী চুম্বকের মতো, যা যুগে যুগে দেশের পথপ্রদর্শক বহু মহান পুরুষ ও নারীর জন্ম দিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের বাণী স্মরণ করলেন চিঠিতে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি বাণীও উদ্ধৃত করেন সিভি আনন্দ বোস। তিনি লিখেছেন,"এই জপ, গান আর পুঁথির বাণী ছেড়ে দাও... তিনি সেখানে আছেন, যেখানে চাষি কঠিন মাটি চাষ করছে এবং যেখানে পথিক পাথর ভাঙছে।" এই উদ্ধৃতির মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, মানুষের শ্রম ও সংগ্রামের মধ্যেই প্রকৃত শক্তি ও মানবতার প্রকাশ ঘটে।
বাংলার উন্নতির জন্য শুভকামনা
চিঠির শেষে বাংলার মানুষের জন্য শুভেচ্ছা ও আশীর্বাদ জানিয়েছেন বিদায়ী রাজ্যপাল। তিনি লেখেন, বাংলার মানুষ ভবিষ্যতে আরও উচ্চতায় পৌঁছাবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন এবং সেই যাত্রায় নিজের সামান্য অবদান রাখার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলা আগামী দিনে আরও গৌরবের উচ্চতায় পৌঁছাবে এবং মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য বয়ে আনবে। চিঠির শেষ লাইনে তিনি লেখেন-"মা দুর্গা আমার জনগণকে রক্ষা করুন। বন্দে মাতরম।"
হঠাৎ ইস্তফা, তারপর দিল্লি সফর
উল্লেখ্য, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই গত ৫ মার্চ আচমকাই রাজ্যপালের পদ থেকে ইস্তফা দেন ডঃ সি ভি আনন্দ বোস। সেই দিনই তিনি কলকাতা থেকে দিল্লি চলে যান। তিন দিন পর গত রবিবার ফের কলকাতায় ফিরে আসেন। ইস্তফার কারণ হিসেবে তিনি জানান, নিজের ইচ্ছাতেই পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কলকাতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার পর তিনি লোকভবনে না গিয়ে দক্ষিণ কলকাতার একটি অতিথিশালায় ওঠেন।
Read more news like this on bengali.timesnownews.com

