এল নিনো প্রভাব: ২০২৬ সালে ভারতে চরম খরার আশঙ্কা, টান পড়তে পারে আপনার পকেটেও
ভারতীয় আবহাওয়া বিভাগ (IMD) জানিয়েছে, এই বছর 'এল নিনো' প্রভাবের কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত হতে পারে। এটি ভারতের কৃষি খাত এবং গ্রামীণ অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত দুঃসংবাদ। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে দেশের জিডিপি (GDP) থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের পকেট-সবকিছুর ওপরই এর সরাসরি প্রভাব পড়বে।
কম বৃষ্টির কারণে ফলন কম হবে, যার ফলে খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়বে এবং মুদ্রাস্ফীতি দেখা দেবে। (el nino 2026 india)
বিগত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে দুর্বল বর্ষার পূর্বাভাস
২০২৬ সালে ভারত গত কয়েক বছরের মধ্যে সবচেয়ে শুষ্ক বর্ষার মুখোমুখি হতে পারে। বেসরকারি আবহাওয়া সংস্থা 'স্কাইমেট'-এর মতে, এই বছর দীর্ঘমেয়াদী গড় বৃষ্টির (LPA) মাত্র ৯৪% বৃষ্টি হতে পারে, যা স্বাভাবিক সীমার (৯৬-১০৪%) চেয়ে কম। অন্যদিকে, IMD-র মতে এটি গত ৫০ বছরের গড়ের মাত্র ৯২% হতে পারে। এল নিনোর কারণে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি বা খরার সম্ভাবনা এবার ৭০%-যা ২০২৩ সালের তুলনায় অনেক বেশি।
এল নিনো ও বর্ষার সম্পর্ক: ১০ বারের মধ্যে ৭ বারই ব্যর্থ বর্ষা
১৯৮০ সালের পর থেকে দেখা গেছে, যে বছরগুলোতে এল নিনো সক্রিয় ছিল, তার ৭০% ক্ষেত্রেই বর্ষা দুর্বল হয়েছে। প্রশান্ত মহাসাগরের পরিস্থিতির সঙ্গে ভারতের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের বৃষ্টির এক গভীর সম্পর্ক রয়েছে। আমেরিকা ও ইউরোপের আবহাওয়া সংস্থাগুলো জানিয়েছে, আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে এল নিনো শুরু হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল এবং এটি আগের অনুমানের চেয়েও শক্তিশালী হতে পারে।
এল নিনো (El Nino) কী?
এল নিনো হলো জলবায়ু সংক্রান্ত একটি প্রাকৃতিক ঘটনা। এতে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের জল অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে যায়। এই উষ্ণতা বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক চক্রকে নষ্ট করে দেয়, যার ফলে সারা বিশ্বের আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসে।
এটি কীভাবে কাজ করে?
- স্বাভাবিক অবস্থায়: সামুদ্রিক বাতাস গরম জলকে পশ্চিম দিকে (দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার দিকে) ঠেলে দেয়। ফলে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগর ঠান্ডা থাকে।
- এল নিনোর সময়: এই বাতাস দুর্বল হয়ে পড়ে বা দিক পরিবর্তন করে। ফলে গরম জল দক্ষিণ আমেরিকার দিকে ফিরে যায়। এতে সমুদ্রের তাপমাত্রা ও বায়ুমণ্ডলের ভারসাম্য বিগড়ে যায়।
ভারতের ওপর এল নিনোর প্রভাব
১. বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তন:
স্বাভাবিক সময়ে আর্দ্র বাতাস ভারত মহাসাগরের দিকে আসে, যা ভালো বৃষ্টি ঘটায়। কিন্তু এল নিনোর সময় এই আর্দ্রতা ভারতের দিকে না এসে উল্টো দিকে (আমেরিকার দিকে) ঘুরে যায়। ফলে মেঘ পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘনীভূত হতে পারে না এবং বৃষ্টিপাত কম হয়।
২. বর্ষায় দেরি এবং দীর্ঘ খরা:
এল নিনোর কারণে বর্ষা কেরালা উপকূলে পৌঁছাতে দেরি করে। এছাড়া বৃষ্টির মাঝে দীর্ঘ 'ড্রাই স্পেল' বা শুষ্ক সময় দেখা দেয়, যা মাঠের ফসল শুকিয়ে দেয়। কম বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়ে যায় এবং তাপপ্রবাহ (Heat wave) দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের ওপর ঝুঁকি
ভারতের প্রায় ৪০% কর্মীবাহিনী সরাসরি কৃষিকাজের ওপর নির্ভরশীল। দুর্বল বর্ষা মানেই কৃষি উৎপাদন হ্রাস এবং গ্রামীণ এলাকায় চাহিদাই কমে যাওয়া। অতীতে দেখা গেছে, যখনই বৃষ্টি কম হয়েছে, তখনই খাদ্যদ্রব্যের দাম আকাশছোঁয়া হয়েছে। বর্তমানে ইরান সংকটের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থা এমনিতেই বিঘ্নিত, তার ওপর দুর্বল বর্ষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
কৃষকদের ওপর দ্বিমুখী মার
স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত কেবল খরিফ (গরমকালের) শস্যের ক্ষতি করে না, বরং রবি (শীতকালের) শস্যের ওপরও প্রভাব ফেলে। কারণ মাটিতে আর্দ্রতা কম থাকে এবং সেচের জন্য জলাশয়গুলোতে পর্যাপ্ত জল থাকে না। এর ফলে সামগ্রিক খাদ্যশস্য উৎপাদন ব্যাহত হয়, যা দেশের প্রবৃদ্ধির গতি ধীর করে দেয়।
এল নিনোর এই ছায়া কেবল মেঘের ওপর নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও আশঙ্কার মেঘ তৈরি করছে। সঠিক জল ব্যবস্থাপনা এবং আগাম পরিকল্পনাই এখন একমাত্র ভরসা।
Read more news like this on bengali.timesnownews.com

