বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে রাজ্যজুড়ে তুমুল উত্তেজনার মাঝেই শুরু হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়া। জানেন কী, Census 2027 হতে চলেছে ভারতের ১৬তম এবং স্বাধীনতার পর ৮ম জনশুমারি। ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া এই Census বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ একদিকে দীর্ঘ ১৫ বছরের বিরতির পর প্রথমবার আয়োজিত হচ্ছে, অন্যদিকে এটিই দেশের প্রথম সম্পূর্ণ ডিজিটাল জনশুমারি।
ভারতে Census শুধু সংখ্যা গণনা নয়, দেশের আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনার অন্যতম শক্ত ভিত্তি। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ আমলে এর সূচনা, আর ১৮৮১ থেকে প্রতি দশকে এই প্রক্রিয়া নিয়মিত চলছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের Census দেশের জনসংখ্যা ও ভৌগোলিক বাস্তবতার স্পষ্ট ছবি তুলে ধরেছিল। আইনগতভাবে Census পরিচালিত হয় Census Act, 1948 এবং Census Rules, 1990 অনুযায়ী। ২০২১ সালে এই Census হওয়ার কথা থাকলেও, কোভিড মহামারি ও লকডাউনের কারণে তা পিছিয়ে যায়-স্বাধীন ভারতে যা ছিল নজিরবিহীন ঘটনা।
এবার বড় পরিবর্তন-কাগজ নয়, মোবাইল অ্যাপ ও 'Self Enumeration' পোর্টালের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ। অর্থাৎ ডিজিটাল ভারতের প্রতিফলন এবার সরাসরি Census-এ। ইতিমধ্যেই হাউস লিস্টিংয়ের জন্য ৩৩টি প্রশ্ন নির্ধারণ করা হয়েছে এবং নাগরিকদের সুবিধার জন্য ৩৩টি FAQ-ও প্রকাশ করেছে কেন্দ্র।
দীর্ঘ বিরতির পর আবার শুরু হতে চলেছে ভারতের জনশুমারি, আর এবার তা একেবারেই নতুন আঙ্গিকে। Census 2027 শুধুমাত্র বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পুরনো পদ্ধতিতেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং যুক্ত হচ্ছে ডিজিটাল সেলফ-এনুমারেশন। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম ডেটা সংগ্রহ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির বড়সড় সংযোজন ঘটছে, যা ভবিষ্যতের প্রশাসনিক কাঠামোকেও আরও গতিশীল করে তুলবে।
২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকেই শুরু হয়েছে এই বিশাল প্রক্রিয়ার প্রথম ধাপ। বাড়ি ও আবাসন সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি ধাপে ধাপে চালু হয়েছে অনলাইন সেলফ-এনুমারেশন ব্যবস্থা। রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল জুড়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে এই কাজ এগোচ্ছে।
কেন প্রায় ১৫ বছর পর Census?
ভারতে নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১০ বছরে একবার জনশুমারি হয়। শেষবার এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছিল ২০১১ সালে। ২০২১ সালের Census কোভিড-১৯ মহামারির কারণে স্থগিত হয়ে যায়। পাশাপাশি লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ এবং প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের কারণেও তা আর সময়মতো করা সম্ভব হয়নি।
এই দীর্ঘ বিরতির ফলে Census 2027-এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে। কারণ, এই সময়ের মধ্যে দেশের জনসংখ্যা কাঠামো, অর্থনৈতিক গতিবিধি এবং সামাজিক পরিবর্তনে বড় রদবদল ঘটেছে। শহরমুখী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে, কর্মসংস্থানের জন্য অভ্যন্তরীণ স্থানান্তর (migration) বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং ডিজিটাল ব্যবহারের প্রসার ঘটেছে। এই সমস্ত পরিবর্তনের আপডেটেড তথ্য সরকারকে নীতি নির্ধারণ, কল্যাণমূলক প্রকল্প পরিকল্পনা, সম্পদ বণ্টন এবং ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কৌশল তৈরি করতে সাহায্য করবে।
Census 2027-এর সময়সূচি কী?
এই জনশুমারি দুটি প্রধান ধাপে সম্পন্ন হবে-
প্রথম ধাপ (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর ২০২৬):
এই পর্যায়ে বাড়ি ও সম্পত্তি সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। একটি পরিবারের বাসস্থান, সুযোগ-সুবিধা, সম্পদের ধরন-এই সব তথ্য নথিভুক্ত করা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ (ফেব্রুয়ারি ২০২৭):
এই ধাপে জনসংখ্যার বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হবে। এর মধ্যে থাকবে বয়স, লিঙ্গ, শিক্ষা, পেশা, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা এবং কিছু ক্ষেত্রে জাতিগত তথ্যও। দেশজুড়ে এই প্রক্রিয়া ধাপে ধাপে চালানো হবে, যাতে প্রতিটি রাজ্য ও অঞ্চলের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নিশ্চিত করা যায়।
ডিজিটাল Census: কী কী নতুন সংযোজন?
Census 2027 ভারতের প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল জনশুমারি হতে চলেছে। এতে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে-
- ১৬টি আঞ্চলিক ভাষায় সেলফ-এনুমারেশন পোর্টাল
- অনলাইন ও অফলাইন-দুই মাধ্যমেই তথ্য সংগ্রহের সুবিধা
- ম্যাপ-ভিত্তিক টুল ব্যবহার করে বাড়ির সঠিক অবস্থান চিহ্নিতকরণ (Geo-tagging)
- কাগজপত্রের ব্যবহার কমিয়ে দ্রুত ডেটা প্রসেসিং
এই নতুন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। প্রথম দিনেই প্রায় ৫৫,০০০ পরিবার সেলফ-এনুমারেশন ব্যবহার করেছে, যা ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থার ইঙ্গিত দেয়।
কীভাবে করবেন Self-Enumeration?
এই Census-এর সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হল-আপনি নিজেই আপনার পরিবারের তথ্য অনলাইনে জমা দিতে পারবেন। অর্থাৎ, আগের মতো শুধুমাত্র এনুমারেটরের উপর নির্ভর না করে নাগরিকরা নিজেরাই তথ্য দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এতে তথ্য দেওয়ার সময় নিজের সুবিধামতো বেছে নেওয়া যায়, ভুলের সম্ভাবনাও কমে। পাশাপাশি ডিজিটাল রেকর্ড থাকার কারণে ডেটা সংরক্ষণ ও প্রসেসিং আরও দ্রুত ও স্বচ্ছ হবে।
প্রক্রিয়াটি সহজ ও ইউজ়ার ফ্রেন্ডলি-
- মোবাইল নম্বর দিয়ে লগইন করুন
- ডিজিটাল ম্যাপে নিজের বাড়ির অবস্থান নির্ধারণ করুন
- পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিত তথ্য পূরণ করুন
- তথ্য জমা দিয়ে একটি ইউনিক Self-Enumeration ID (SE ID) তৈরি করুন
- পরবর্তীতে যাচাইয়ের সময় এই ID এনুমারেটরকে প্রদান করুন
- পুরো প্রক্রিয়াটি সাধারণত ১৫ থেকে ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন করা যায়। প্রয়োজনে তথ্য আংশিক পূরণ করে ড্রাফট হিসেবে সংরক্ষণ করে পরে সম্পূর্ণ করার সুবিধাও রয়েছে।
নাগরিক হিসেবে কী করবেন?
- যদি আপনার রাজ্যে সেলফ-এনুমারেশন উইন্ডো চালু হয়ে থাকে, তাহলে আগেভাগেই অনলাইনে নিজের পরিবারের তথ্য জমা দেওয়া একটি সহজ ও সুবিধাজনক বিকল্প। এতে শুধু সময়ই বাঁচে না, পরবর্তীতে এনুমারেটরের যাচাই প্রক্রিয়াও অনেক দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সম্পন্ন হয়। বিশেষ করে ব্যস্ত শহুরে জীবনে এই পদ্ধতি অনেকের জন্য কার্যকর হতে পারে।
- তবে মনে রাখতে হবে, সেলফ-এনুমারেশন সম্পূর্ণ ঐচ্ছিক। আপনি যদি অনলাইনে তথ্য না-ও দেন, তবুও সরকারি এনুমারেটর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী আপনার বাড়িতে এসে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করবেন।
- অন্যদিকে, যদি আপনি আগে থেকেই অনলাইনে তথ্য জমা দেন, তাহলে প্রাপ্ত Self-Enumeration ID (SE ID) অবশ্যই সংরক্ষণ করে রাখবেন এবং এনুমারেটর এলে তা দেখাতে হবে। এই ID-এর ভিত্তিতেই আপনার দেওয়া তথ্য যাচাই করা হবে। পাশাপাশি এনুমারেটর বাড়ির নম্বর, Census হাউস নম্বর এবং সেই বাড়ির ব্যবহার (আবাসিক/বাণিজ্যিক ইত্যাদি) সম্পর্কিত অতিরিক্ত তথ্যও নথিভুক্ত করবেন, যাতে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ ও নির্ভুল থাকে।
জনশুমারি, রাজনীতি ও বিরোধীদের বক্তব্য
পাঁচ রাজ্যে জোরদার নির্বাচনী আবহের মাঝেই কেন্দ্র Census 2027-এর প্রক্রিয়া শুরু করায় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে জল্পনা তৈরি হয়েছে। একদিকে সরকার বলছে, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা জনশুমারি শুরু করা প্রশাসনিকভাবে জরুরি ছিল। অন্যদিকে বিরোধী শিবিরের অভিযোগ, ভোটের আগে এই সময়কে বেছে নেওয়ার পিছনে রাজনৈতিক কৌশল থাকতে পারে। বিশেষ করে আপডেটেড জনসংখ্যা ও সামাজিক তথ্য ভবিষ্যতে ডিলিমিটেশন, সংরক্ষণ নীতি বা কেন্দ্রীয় সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলেই মত বিশ্লেষকদের। বিরোধীরা আরও দাবি করছে, নির্বাচনী পরিবেশে Census শুরু হলে তথ্য সংগ্রহের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে পারে। তবে কেন্দ্রের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ প্রশাসনিক এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনেই চালানো হচ্ছে, যার সঙ্গে নির্বাচনের কোনও যোগ নেই।
শুধু গণনা নয়, ভবিষ্যতের ভিত্তি
Census 2027 শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যানগত প্রক্রিয়া নয়-এটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি। সহজভাবে বললে, এই Census-এর মাধ্যমে সংগৃহীত তথ্যই আগামী দিনের নীতি, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা এবং সামাজিক উন্নয়নের রূপরেখা নির্ধারণ করবে। তাই এই প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা শুধু নাগরিক দায়িত্ব নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
Read more news like this on bengali.timesnownews.com

