চাকরি, সেভিংস আর ব্যাঙ্কের লোন-এই পথ পেরিয়েই স্বপ্ন পূরণ হয় নতুন ফ্ল্যাটের চাবি হাতে পাওয়ার। কিন্তু চাবি হাতে আসার পরের দিন থেকেই শুরু হয় আসল লড়াই। এক সাম্প্রতিক হাউজিং রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতার একজন গড় চাকরিজীবী তাঁর মাসিক আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ টাকা ব্যয় করছেন শুধু হোম লোন মেটাতে।
অর্থাৎ, যার মাসিক আয় ৮০,০০০ টাকা, তাঁর ২০,০০০ টাকাই চলে যাচ্ছে ব্যাঙ্কে। উচ্চ আয়ের ক্ষেত্রেও এই অনুপাত একই।
কেন এই ২৫ শতাংশের হিসাব জরুরি? ব্যাঙ্কগুলি সাধারণত FOIR (Fixed Obligation to Income Ratio) দেখে লোন দেয়, যেখানে সব EMI মিলিয়ে আয়ের ৫০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। কিন্তু বাস্তব চিত্র আরও কঠিন। হোম লোনের ২৫ শতাংশের সঙ্গে যদি গাড়ির লোন, ব্যক্তিগত লোন বা ক্রেডিট কার্ডের বিল যুক্ত হয়, তবে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। দীর্ঘমেয়াদী ২০-৩০ বছরের লোনের ক্ষেত্রে এই চাপ আরও প্রকট।
কলকাতা কি অন্য শহরের চেয়ে ভালো? পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মুম্বইতে এই EMI-to-Salary রেশিও প্রায় ৪৫ শতাংশ, বেঙ্গালুরুতে ৩৫ শতাংশ এবং দিল্লি NCR-এ ৩৮ শতাংশ। সেই তুলনায় কলকাতা কিছুটা স্বস্তিতে। নিউটাউন, রাজারহাট বা বারুইপুরের মতো এলাকায় ৩০-৫০ লক্ষের মধ্যে ফ্ল্যাট পাওয়ায় মধ্যবিত্তের স্বপ্ন এখনো জীবিত। তবে গত দুই বছরে RBI-এর রেপো রেট বৃদ্ধি পাওয়ায় সুদের হার ৬.৯% থেকে বেড়ে ৯.১% হয়েছে। পাশাপাশি নির্মাণ সামগ্রীর দাম বাড়ায় ফ্ল্যাটের দামও ১২-১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে, ২০২৩ সালে যে EMI ২২,০০০ টাকা ছিল, ২০২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ২৬,০০০ টাকা। সবচেয়ে বেশি সংকটে ৩০-৪৫ লক্ষ টাকা বাজেটের ক্রেতারা।
বিশেষজ্ঞদের ৪টি পরামর্শ:
১. ডাউন পেমেন্ট: ২০% এর বদলে ৩০-৪০% ডাউন পেমেন্ট দিতে পারলে সুদের বোঝা অনেক কমবে।
২. লোনের মেয়াদ: ২০ বছরের বদলে ৩০ বছরের মেয়াদে EMI প্রায় ১৫% কমে আসে, তবে মোট সুদের পরিমাণ বাড়ে।
৩. স্টেপ-আপ EMI: আয়ের সাথে তাল মিলিয়ে যারা লোনের কিস্তি বাড়াতে পারেন, তাদের জন্য এটি দারুণ বিকল্প।
৪. প্রি-পেমেন্ট: বছরে অন্তত একবার বোনাস বা ইনক্রিমেন্টের টাকা দিয়ে আসল কমিয়ে ফেললে লোনের মেয়াদ দ্রুত শেষ হয়।
আর্থিক উপদেষ্টাদের মতে, হোম লোনের EMI যেন কোনোভাবেই আয়ের ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে না যায়। ২৫ শতাংশকে 'সেফ জোন' ধরা হয়। বাড়ি কেনার আগে অবশ্যই ৬ মাসের EMI-এর সমান একটি ইমার্জেন্সি ফান্ড তৈরি রাখা উচিত। কলকাতায় নিজের বাড়ি কেনার স্বপ্নটি এখনো নাগালের মধ্যে থাকলেও, ফ্ল্যাট বুক করার আগে বর্তমান আয় ও জীবনযাত্রার সাথে ভবিষ্যতের প্ল্যানটিও নিখুঁতভাবে হিসেব করে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। অন্যথায়, ফ্ল্যাট হবে ঠিকই, কিন্তু বাকি জীবনে কাটছাঁট করতে করতে নাভিশ্বাস উঠবে।

