২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভরাডুবির পর তৃণমূল কংগ্রেসের অন্দরের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ এবার আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল। হারের ময়নাতদন্ত করতে গিয়ে পরাজিত তৃণমূল বিধায়ক এবং দাপুটে নেতারা এখন সরাসরি দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাক-এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন।
পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, জোড়াসাঁকো থেকে ফরাক্কা- সর্বত্রই এখন 'ঘরের শত্রু বিভীষণ' খোঁজার হিড়িক পড়ে গিয়েছে।
সবচেয়ে আক্রমণাত্মক মেজাজে পাওয়া গেল জোড়াসাঁকোর প্রাক্তন বিধায়ক বিবেক গুপ্তকে। আইপ্যাক-কে তীব্র আক্রমণ করে তিনি বলেন, "আইপ্যাক হচ্ছে একদম চিটিংবাজ, গদ্দার ও চোর। আমাদের অভ্যন্তরীণ মিটিংয়ের লিঙ্ক কীভাবে বিজেপির কাছে যেত? এই সংস্থা আমাদের গোপন তথ্য বিরোধীদের সরবরাহ করেছে। আমাকে বলা হচ্ছে আমার নাকি দলে কোনো অবদান নেই! নেত্রী বা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এই গদ্দারি জানতেন কি না, তা জানারও উপায় নেই। কারণ নেতৃত্বের সঙ্গে কথা বলার কোনো অ্যাক্সেস আমাদের দেওয়া হয়নি। সব কি আর ওঁর পিএ-কে বলা যায়?"
অন্যদিকে, দলের আধুনিকীকরণ ও 'কর্পোরেট স্টাইল' নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কাশীপুর-বেলগাছিয়ার পরাজিত প্রার্থী অতীন ঘোষ। তাঁর মতে, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল স্তর থেকে উঠে আসা নেতা নন, তাই আধুনিক প্রযুক্তি দিয়ে সাধারণ মানুষের পালস বোঝা সম্ভব নয়। ব্যারাকপুর পুরসভার চেয়ারম্যান উত্তম দাসও একই সুরে বলেন, "১৯৯৮ সাল থেকে দল করছি, অথচ আমাদের মতো পুরোনো কর্মীদের অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের টিমের সঙ্গে কোনো মিল নেই। আকাশ-পাতাল ফারাক আমাদের চিন্তাধারায়।"
সবচেয়ে মারাত্মক অভিযোগটি করেছেন প্রাক্তন বিধায়ক কৃষ্ণেন্দু নারায়ণ চৌধুরী। তিনি সরাসরি বিপর্যয়ের দায় একজনের ওপর চাপিয়ে দিয়ে বলেন, "দলটাকে তিলে তিলে শেষ করে দিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। ওঁর অহঙ্কারই ডুবিয়েছে আমাদের।" একই সুরে রত্না চট্টোপাধ্যায়ও নেতাদের ঔদ্ধত্য ও সাধারণ কর্মীদের এড়িয়ে চলার প্রবণতাকে হারের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
নারায়ণগড়ের প্রাক্তন বিধায়ক সূর্যকান্ত অট্ট অভিযোগ তোলেন যে, গত কয়েক বছরে সংগঠনে কোনো গণতন্ত্র ছিল না। এমনকি বিধায়ক বা সাংসদদের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করতেও বাধা দেওয়া হতো। তবে ফরাক্কার মণিরুল ইসলাম যেন সব সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছেন। তাঁর সোজাসাপ্টা বক্তব্য, "অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্ব বাংলার মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছে। উনি বিধায়ক-সাংসদদের চাকর মনে করতেন। আমার কাছে উনি অভিষেক নয়, অভিশাপ।" মন্ত্রী চন্দ্রনাথ সিংহ সহ একাধিক হেভিওয়েট নেতার গলায় এখন একই সুর। এই গণবিদ্রোহের পর তৃণমূলের শীর্ষ নেতৃত্ব কীভাবে ড্যামেজ কন্ট্রোল করে, সেটাই এখন দেখার।

