শিখধর্মের সুমহান এবং গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসে তৃতীয় শিখ গুরু, অমর দাস জীর সমগ্র জীবন নিঃস্বার্থ সেবা, বিনম্রতা, ত্যাগ এবং ঈশ্বরের প্রতি অবিচল ভক্তির এক অতুলনীয় ও অনন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে খোদিত রয়েছে। ১৪৭৯ সালের ৫ই মে পাঞ্জাবের অমৃতসর জেলার বাসরকে গিলান গ্রামে জন্ম নেওয়া অমর দাস জী যৌবনকালে দীর্ঘ একুশ বছর ধরে প্রতি বছর গঙ্গা স্নান ও তীর্থযাত্রার মাধ্যমে মোক্ষলাভের চেষ্টা করলেও প্রকৃত আধ্যাত্মিক শান্তি খুঁজে পাচ্ছিলেন না।
অবশেষে ষাটোর্ধ্ব বয়সে একদিন পুত্রবধূ বিবি আমরো জীর মুখে গুরু নানক দেব জীর পবিত্র বাণী শুনে তাঁর জীবন সম্পূর্ণ বদলে যায়। খাদুর সাহিবে উপস্থিত হয়ে তিনি দ্বিতীয় শিখ গুরু, গুরু অঙ্গদ দেব জীর চরণে আশ্রয় নেন এবং গুরুর গৃহকেই নিজের সর্বস্ব বলে মনে করেন।
বিনা স্বার্থে ও সম্পূর্ণ অহংকারহীনভাবে টানা বারো বছর ধরে গুরু অঙ্গদ দেব জীর সেবা করে গেছেন অমর দাস জী। প্রতিদিন ব্রহ্মমুহূর্তে সুদূর বিয়াস নদী থেকে মাথায় এক কলসি ঠান্ডা জল এনে গুরুর স্নানের ব্যবস্থা করা ছিল তাঁর নিত্যদিনের রুটিন। প্রচণ্ড শীত, ঝড় বা মুষলধারে বৃষ্টির মতো চরম প্রতিকূল আবহাওয়াতেও তাঁর এই নিয়মে কখনো একচুলও ব্যত্যয় ঘটেনি। এমনকি এক গভীর রাতে প্রবল ঝড়-বৃষ্টির সময় নদীর জল এনে ফেরার পথে তাঁতির গর্তে পা আটকে পড়ে গেলেও তিনি মাথায় থাকা জলের কলসিটিকে পড়তে দেননি। তাঁর এই অসামান্য নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগে মুগ্ধ হয়ে গুরু অঙ্গদ দেব জী তাঁকে আশীর্বাদ করেছিলেন এবং ১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে ৭৩ বছর বয়সে তাঁকে শিখদের তৃতীয় গুরু হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন।
গুরু অমর দাস জীর এই গুরুপদে আসীন হওয়ার প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী সময়ে তাঁর দুই পুত্র দাসু ও দাতু জীকে বাদ দিয়ে জামাতা ভাই জেঠা জীক (যিনি পরবর্তীতে চতুর্থ শিখ গুরু রাম দাস নামে পরিচিত হন) উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নেওয়ার সিদ্ধান্তটি শিখ ইতিহাসের এক যুগান্তকারী অধ্যায়। গুরুজির পুত্রেরা জাগতিক আসক্তি, অহংকার এবং ক্ষমতার মোহে আচ্ছন্ন থাকায় এবং গুরুর নির্দেশিত পরীক্ষার সময় ধৈর্য হারিয়ে ফেলায় তাঁরা এই পদের অযোগ্য বিবেচিত হন। অপরদিকে, অনাথ বালক হিসেবে জীবন শুরু করা ভাই জেঠা জী অত্যন্ত বিনয়ী ও সেবাপরায়ণ মনোভাব নিয়ে দিনরাত মাটি বয়ে কূপ নির্মাণ থেকে শুরু করে গুরুর কঠিন পরীক্ষার প্রতিটি পদক্ষেপে নিঃশর্ত আনুগত্য ও চরম সহনশীলতার পরিচয় দিয়েছিলেন।
গুরুপদ কেবল কোনো পারিবারিক উত্তরাধিকার বা রক্তসূত্রের জন্মগত অধিকার নয়, বরং তা কেবল প্রকৃত ভক্তি, নিঃস্বার্থ সেবা এবং আধ্যাত্মিক যোগ্যতার মাধ্যমেই অর্জন করা সম্ভব-এই চিরন্তন সত্যটি গুরু অমর দাস জী ও গুরু রাম দাস জী তাঁদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন। তৃতীয় গুরু হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি সমাজে প্রচলিত সতীদাহ প্রথা, পর্দা প্রথা এবং জাতিভিত্তিক অস্পৃশ্যতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেন। পাশাপাশি, 'প্রথমে পঙ্গত, তারপর সঙ্গত' এই নিয়ম বাধ্যতামূলক করে তিনি লঙ্গর প্রথার এক অনন্য সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে সাধারণ প্রজা থেকে শুরু করে স্বয়ং মুঘল সম্রাট আকবর পর্যন্ত মাটিতে বসে এক সারিতে অন্নগ্রহণ করেছিলেন।

