রুপোলি পর্দা নয়, এ এক চরম বাস্তব ট্র্যাজেডি। এক প্রাক্তন সেনাকর্মী, যিনি দেশসেবা শেষে রাজনীতির আঙিনায় পা রেখেছিলেন শুভেন্দু অধিকারীর আপ্ত সহায়ক হিসেবে- সেই চন্দ্রনাথ রথের নৃশংস হত্যাকাণ্ড এখন বঙ্গ রাজনীতির সবথেকে বড় শিরোনাম। বৃহস্পতিবার সকালে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রাম থেকে চন্দ্রনাথের নিথর দেহ যখন তাঁর গ্রামের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুরের কুলুপে পৌঁছানোর প্রস্তুতি চলছে, তখন গ্রামের বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে স্বজনদের কান্নায়।
বুধবার রাতে মধ্যমগ্রামের দোহাড়িয়া এলাকায় দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যান চন্দ্রনাথ। এই ঘটনার পর থেকেই শোকের পাহাড় ভেঙে পড়েছে তাঁর পরিবারে। একদিকে স্বামীহারা স্ত্রীর আগ্নেয়গিরির মতো ক্ষোভ, অন্যদিকে পুত্রহারা মায়ের করুণ আর্তি- এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে স্তম্ভিত গোটা গ্রাম। চন্দ্রনাথের স্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, যারা তাঁর স্বামীর বুক গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে, পুলিশ যেন তাদের খুঁজে বের করে 'এনকাউন্টার' করে। তাঁর কথায়, "আইন-আদালতে নয়, ঘাতকদের বিচার হোক রাস্তাতেই।"
তবে চন্দ্রনাথের মা হাসিরানি রথের কণ্ঠে ঝরে পড়ল এক বিষণ্ণ আর্তি। তিনি বলেন, "আমি মা, আমি জানি সন্তান হারানোর জ্বালা কী। তাই আমি ঘাতকদের ফাঁসি চাই না। ফাঁসি দিলে তো সব শেষ হয়ে যাবে। আমি চাই ওদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হোক। ওরা সারা জীবন জেলের চার দেওয়ালের মাঝে পচে মরুক।" কান্নায় ভেঙে পড়ে তিনি আরও যোগ করেন, "শুভেন্দুবাবু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারানোর পর থেকেই আমাদের পরিবার টার্গেট হয়ে গিয়েছিল। তৃণমূলের নেতারা বলত ৪ তারিখের পর দিল্লির বাবারাও বাঁচাতে পারবে না। ওরা সেটাই করে দেখাল। আমার ছেলে দুর্ঘটনায় মারা গেলে এত কষ্ট হত না, কিন্তু এই নৃশংসতা মানতে পারছি না।"
ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল ও নিহতের বাড়িতে পৌঁছেছেন বঙ্গ বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুভেন্দু অধিকারী স্বয়ং হাসপাতালে গিয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই খুন নিছক অপরাধ নয়, বরং এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। চন্দ্রনাথ এয়ারফোর্সের প্রাক্তন কর্মী ছিলেন, ফলে তাঁর এই দক্ষ রণকৌশল জানাল ব্যক্তিকেও যেভাবে পরিকল্পনা করে মারা হয়েছে, তাতে পেশাদার খুনিদের যোগ স্পষ্ট।
বিজেপি সূত্রের খবর, ময়নাতদন্তের পর বিকেলে দেহ গ্রামে পৌঁছালে পরিবার ও স্থানীয় নেতৃত্বের উপস্থিতিতে শেষকৃত্য সম্পন্ন হবে। আপাতত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঈশ্বরপুর ও কুলুপ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ বাহিনী। টায়ার জ্বালিয়ে পথ অবরোধ ও বিক্ষোভের আগুনে এখন তপ্ত মেদিনীপুর, যার রেশ আছড়ে পড়ছে রাজ্য রাজনীতির অলিন্দে।

