পৃথিবীর বিশালতায় নিজেকে প্রায়ই একা মনে হয়, কিন্তু সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরতে থাকা 'হামশকল' বা একই রকম দেখতে সাতজন মানুষের গল্প আমাদের কৌতূহলী করে তোলে। অনেক সময় অচেনা কারও ছবি দেখে আমরা থমকে যাই, কারণ তাঁর মুখের সঙ্গে আমাদের পরিচিত কারও মুখের অবিকল মিল। কিন্তু এই প্রচলিত ধারণা কি আদৌ বাস্তব?
প্রতিটি মানুষের কি পৃথিবীতে সত্যিই সাতটি কার্বন কপি রয়েছে? বিজ্ঞান এই ভাইরাল মিথের বিষয়ে কী বলছে, চলুন জেনে নেওয়া যাক।
বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে হামশকল:
সোজা কথায় বলতে গেলে, প্রত্যেকের ঠিক সাতজন করে হামশকল রয়েছে-এই দাবির স্বপক্ষে আজ পর্যন্ত কোনো জোরালো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। গবেষক ও বিজ্ঞানীদের মতে, এটি কোনো প্রমাণিত সত্য নয়, বরং লোকমুখে প্রচলিত একটি বিশ্বাস বা 'আরবান লিজেন্ড'। বিশ্বের বিপুল জনসংখ্যার মাঝে কিছু মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্যের আংশিক মিল থাকাটা পরিসংখ্যানগতভাবে অস্বাভাবিক নয়, কিন্তু একদম হুবহু একই রকম মানুষ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য।
কেন আমাদের কাউকে একই রকম মনে হয়?
মানুষের মুখের গঠন মূলত জিনের জটিল বিন্যাসের ওপর নির্ভর করে। চোখ, নাক, ঠোঁট, চোয়াল এবং মুখের দৈর্ঘ্যের হাজারো রকমফের রয়েছে। অনেক সময় ভিন্ন দেশ বা সংস্কৃতির মানুষের মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্যের কিছু সাদৃশ্য দেখা দিতে পারে। তবে এখানে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে আমাদের মস্তিষ্ক। মানুষের মস্তিষ্ক অত্যন্ত দক্ষভাবে প্যাটার্ন বা মিল খুঁজে বের করতে পারে। যখনই আমরা কোনো ব্যক্তির চোখের চাউনি বা হাসির ভঙ্গিতে পরিচিত কারো ছায়া দেখি, আমাদের মস্তিষ্ক তৎক্ষণাৎ একটি 'মিল' তৈরি করে নেয়। কিন্তু যদি খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করা হয়, তবে একই রকম দেখতে মনে হওয়া ওই দুই ব্যক্তির মধ্যে সূক্ষ্ম অথচ অগণিত পার্থক্য স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
দাবির সত্যতা ও বাস্তবতা:
গত কয়েক বছরে বিশ্বজুড়ে একাধিক সামাজিক প্রকল্প ও গবেষণায় মানুষ নিজেদের 'হামশকল' খোঁজার চেষ্টা করেছেন। ইন্টারনেটের দৌলতে অনেক সময় এমন মানুষের ছবি সামনে এসেছে, যারা দেখতে প্রায় যমজ ভাইয়ের মতো। তবে সেই মিল মূলত দৃষ্টিভ্রম বা বিশেষ কোণ থেকে তোলা ছবির কারসাজি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, তাদের শারীরিক গঠন বা মুখের মাপজোক কখনোই সম্পূর্ণ অভিন্ন নয়।
অতএব, পৃথিবীর কোনো কোণে আপনার মতো দেখতে সাতজন মানুষ ঘুরে বেড়াচ্ছে-এই ধারণাটি রোমান্টিক বা রহস্যময় মনে হলেও, এর পেছনে কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। আমরা প্রত্যেকেই আমাদের বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে অনন্য। পৃথিবীর এই অসীম বৈচিত্র্যের ভিড়ে হয়তো দু-চারজন মানুষের সাথে আপনার চেহারার কিছুটা মিল থাকতে পারে, কিন্তু সেটাই কোনো জাদুকরী বা বৈজ্ঞানিক গাণিতিক নিয়মে বাঁধা নয়। তাই এখন থেকে যখনই কাউকে নিজের মতো দেখতে পাবেন, নিশ্চিত থাকুন এটি কেবলই কাকতালীয় কোনো সাদৃশ্য।

