Dailyhunt
শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে বড় অন্তরায় রিয়েলিটি শো

শিশুদের স্বাভাবিক জীবনে বড় অন্তরায় রিয়েলিটি শো

Truth Of Bengal 1 month ago

প্রভাত কুমার মিত্র: রিয়েলিটি শো। আজ টেলিভিশনের পর্দায় এই সংক্রান্ত কত ভিন্ন ভিন্ন অনুষ্ঠান। সন্ধ্যা হলেই শুরু হয়ে যায়। ঝাঁ-চকচকে বিশাল মঞ্চ, ঝলমলে আলোয় আলোকিত। চারপাশে ক্যামেরা, মাইক, আর সামনে একদল হাস্যমুখ বিচারক। টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে একঝাঁক শিশুর নিষ্পাপ মুখ, যারা তাদের স্বপ্নের ডানায় ভর করে উড়তে এসেছে এই রঙিন জগতে।

কিন্তু এই ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক নির্মম বাস্তবতা, যেখানে অবুঝ শিশুদের স্বপ্নগুলোকে পণ করে চলে এক নির্মম বাণিজ্যিক খেলা।

এই ঝলমলে পর্দার আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক কঠোর বাস্তবতা, যেখানে শিশুদের নিষ্পাপ স্বপ্নগুলো প্রায়শই বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে বলি হয়। রিয়্যালিটি শো-এর রঙিন জগতে পা দিয়ে অনেক শিশু অসম প্রতিযোগিতার মুখে পড়ে। জয়-পরাজয়ের নির্মম খেলা তাদের কোমল মনে গভীর ক্ষত তৈরি করে। ক্যামেরার সামনে তাদের হাসি-কান্না অনেক সময়ই স্ক্রিপ্টের অংশ, যা শিশুদের স্বাভাবিক শৈশব, খেলাধুলো এবং আনন্দ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।

এই ধরনের শো-তে বিচারকদের মন্তব্য এবং দর্শকদের প্রত্যাশা শিশুদের উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। একটি সামান্য ভুল পারফরম্যান্স বা সমালোচনামূলক মন্তব্য তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে দিতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে শিশুদের এমন পারফর্ম করতে হয় যা তাদের বয়সের জন্য উপযুক্ত নয়, যা শারীরিক ও মানসিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

বাণিজ্যিক মুনাফার জন্য শিশুদের আবেগ ও স্বপ্ন নিয়ে এই খেলা বন্ধ হওয়া উচিত। শিশুদের শৈশবকে রক্ষা করা এবং তাদের সত্যিকারের প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা আমাদের সকলের মানবিক দায়িত্ব। শিশুদের কঠিন গান গাওয়া এবং অশ্লীল নাচের প্রতিযোগিতার নামে শোষণ, যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব এবং নৈতিক অবক্ষয় তুলে ধরা হয়েছে। এই সমস্যাটি একটি জটিল বিষয়, যেখানে প্রযুক্তি, সামাজিক চাপ এবং নৈতিকতার প্রশ্ন জড়িয়ে আছে। আধুনিক রিয়্যালিটি শো-এর যুগে, আমরা প্রায়শই দেখি যে শিশুরা তাদের বয়সের তুলনায় অনেক কঠিন গান গাইছে বা নাচের পারফরম্যান্স করছে। এই পারফম্যান্সগুলি কখনও কখনও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় উন্নত বা পরিবর্তিত হয়, যা প্রতিভা এবং প্রযুক্তির মধ্যে পার্থক্য অস্পষ্ট করে তোলে। এর ফলে, দর্শকের কাছে যা অসাধারণ প্রতিভা হিসেবে ধরা দেয়, তা হয়তো প্রযুক্তির ফল।

এই ধরনের প্রতিযোগিতায় শিশুদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করে, যা তাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়াও, কিছু ক্ষেত্রে, শিশুদের এমন গান বা নাচের স্টেপ করতে বাধ্য করা হয় যা তাদের বয়সের জন্য অনুপযুক্ত বা অশ্লীল হতে পারে। এটি শিশুদের নৈতিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে এবং তাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে।

অভিভাবকদের ভূমিকাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক সময় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের খ্যাতির লোভে বা আর্থিক লাভের আশায় এই ধরনের প্রতিযোগিতায় ঠেলে দেন। এটি শিশুদের শৈশবকে ব্যাহত করে, তাদের খেলার সময়, পড়াশোনার অধিকার এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন থেকে বঞ্চিত করে। শিশুরা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হলে তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা এবং মানসিক চাপ তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার আরও উদ্বেগজনক। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি শিশুদের কণ্ঠ বা নাচের পারফরম্যান্স এমনভাবে পরিবর্তন করতে পারে যে এটি তাদের আসল ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি উন্নত মনে হয়। এর ফলে, প্রতিভা নির্বাচনের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা কমে আসে এবং শিশুরা তাদের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বাধাগ্রস্ত হয়।

নৈতিক অবক্ষয় এই সমস্যার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যখন শিশুরা শুধু প্রতিযোগিতার একটি উপকরণ হিসেবে বিবেচিত হয়, তখন সমাজের নৈতিক মূল্যবোধ ক্ষুণ্ন হয়। শিশুদের সুরক্ষা এবং সুস্থ বিকাশের অধিকার লঙ্ঘিত হয়।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য, আমাদের সকলের সচেতন হওয়া প্রয়োজন। রিয়্যালিটি শো-এর প্রযোজক, উপস্থাপক এবং দর্শকদের শিশুদের অধিকার এবং সুস্থ বিকাশের প্রতি আরও সংবেদনশীল হতে হবে। আইনগতভাবেও শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কঠোর নিয়ম তৈরি করা এবং সেগুলি প্রয়োগ করা জরুরি। শিশুদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেওয়া উচিত, কিন্তু তা যেন তাদের শৈশবকে কেড়ে না নেয়, সেই দিকে নজর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

আজকাল টিভির রিয়েলিটি শো যেন এক বিভ্রান্তির মেলা। লতা, আশা, মান্না, হেমন্ত, সন্ধ্যা, রফি, কিশোর- এঁদের গান কোনওদিনই কেবল সুরের খেলা ছিল না। ছিল বছরের পর বছর সাধনা, তালিম, দীক্ষা ও জীবনভর আত্মনিবেদনের ফল। অথচ আজ সাত-আট বছরের শিশুদের গলায় সেই অমূল্য গান গুঁজে দেওয়া হচ্ছে, যেন খেলার পুতুল!

এই শিশুদের ভয়েস এখনও কোমল, অপরিণত। তাদের কণ্ঠের সীমা অতিক্রম করিয়ে 'বড়দের গান' গাওয়ানো মানে প্রকৃতপক্ষে তাদের ভবিষ্যৎ কণ্ঠস্বরকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। অথচ উপস্থাপকরা ও বিচারকরা হাততালি দিয়ে চলেছেন, দর্শকরা তালি দিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন।

তার চেয়েও ভয়ঙ্কর- অশ্লীল নাচের ভঙ্গি, উগ্র মেকআপ, কৃত্রিম সাজগোজ দিয়ে শিশুদের যে রূপে উপস্থাপন করা হয়, তা তাদের সরল শৈশবকে কেড়ে নিচ্ছে। এ এক ধরনের মানসিক শোষণ, যেখানে আর্থিক প্রত্যাশা ও টিআরপি নামক দানবের কাছে নিষ্পাপ শৈশব বলি যাচ্ছে।

অভিভাবকেরাও ভুলে যাচ্ছেন- সন্তান মানে বাজারের পণ্য নয়। শিল্পচর্চা মানে অস্থায়ী গ্ল্যামার নয়; বরং ধৈর্য, অনুশাসন ও অন্তরের সাধনা। শিশুদের প্রকৃত প্রতিভাকে বিকশিত হতে দিন, জোর করে 'তারকা' বানাতে গিয়ে তাদের অকালেই নিঃশেষ করবেন না।

রিয়েলিটি শো-র বর্তমান চিত্র আমাদের সাংস্কৃতিক রুচি ও শিল্পবোধকে এক অদ্ভুত সংকটে ফেলে দিচ্ছে। বিচারকের আসনে যাঁরা বসেন, তাঁদের কাছ থেকে দর্শক প্রত্যাশা করেন মার্জিত রুচি, পরিশীলিত অভিব্যক্তি এবং গঠনমূলক মন্তব্য। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, বিচারকরা যেন অভিনব নাটুকেপনা, অতিরঞ্জিত মুখভঙ্গি আর অনাবশ্যক সিটি বাজানোতেই বেশি ব্যস্ত। এ এক ধরনের 'পাড়ার আড্ডা সংস্কৃতি'র রূপ, যা জাতীয় স্তরের মঞ্চে প্রকাশ পেলে সত্যিই পীড়াদায়ক মনে হয়।

খুদে শিল্পীরা, যারা মন প্রাণ দিয়ে শিল্পচর্চা করছে, তারা এই অতিরঞ্জিত প্রতিক্রিয়া থেকে শিল্পের আসল মূল্য বোঝার বদলে শিখে নিচ্ছে- শব্দের জোরে, নাটকীয়তার মোড়কে বা অর্থের প্রভাবে কৃত্রিম বিস্ময় প্রকাশ করলেই জনপ্রিয় হওয়া যায়।

আজ সময় এসেছে সচেতন হওয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যেভাবে সত্যি-মিথ্যার সীমারেখা ঘোলাটে করছে, রিয়েলিটি শোগুলোও তেমনই শিশুদের সরলতা কেড়ে নিয়ে তাদেরকে এক গোলকধাঁধায় ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রবাহকে রুখতে না পারলে, আগামী প্রজন্মের শিল্প আর মানসিক সুস্থতা- দুটোই বিপন্ন হবে।

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Truth Of Bengal