জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট- রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী, অবৈধ বাংলাদেশিদের জন্য কড়া হাতে থ্রি-ডি নীতি প্রয়োগে ছাড়পত্র দিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যে ঠাঁই হবে না কোনও অবৈধভাবে প্রবেশকারী বাংলাদেশির। অবৈধ অভিবাসীরা- যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি নাগরিক, নয়তো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের সদস্য -তাদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার তৈরিরও নির্দেশ দিয়েছে রাজ্য সরকার।
মালদা-মুর্শিদাবাদে প্রথম হোল্ডিং সেন্টার
আর সেই নির্দেশ দেওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই মুর্শিদাবাদ ও মালদায় রাজ্যের প্রথম হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করা হয়েছে বলে খবর। উল্লেখ্য, সীমান্তবর্তী এই দুই জেলাতেই বাংলাদেশ থেকে সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশের হার সর্বোচ্চ। তাই এই দুই জেলাতেই স্থানীয় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ সবার আগে হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করেছে বলে খবর। জানা যাচ্ছে, ভগবানগোলা ও লালগোলা থানা এলাকা থেকে ৩ জন অবৈধভাবে অনপ্রবেশকারী বাংলাদেশিকে আটক করে এনে রাখা হয়েছে। ওদিকে, মালদার ইংরেবাজারের চন্দন পার্কেও কড়া নিরাপত্তার মধ্যে প্রথম হোল্ডিং সেন্টার তৈরি করা হয়েছে বলে খবর। সেখানে গাজোলের পান্ডুয়া এলাকা থেকে ৯ জন সন্দেহভাজন বাংলাদেশিকে- যারমধ্যে ৩ জন মহিলা ও ৬ জন শিশুকে এনে রাখা হয়েছে।

হাকিমপুর সীমান্তে বাংলাদেশিদের ভিড়
এদিকে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট- নির্দেশ মেনে যখন বাংলায় CAA কার্যকর করতে তৎপর প্রশাসন, তখনই উত্তর ২৪ পরগনার স্বরূপনগর থানার বিথারী হাকিমপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের হাকিমপুর সীমান্তের চেকপোস্টে ফিরল SIR শুরুর সময়ের ছবি! হাকিমপুর সীমান্তের চেকপোস্টে লক্ষ্য করা গেল ফের বাংলাদেশিদের ঢল। দেশে ফিরতে মরিয়া বাংলাদেশিরা। বাংলাদেশি নথি হাতে নিয়ে দেশে ফেরার জন্য অপেক্ষায় ভারতে আসা 'অনুপ্রবেশকারী'রা। যাঁরা কিনা এই হাকিমপুর চেকপোস্টে দিয়েই ভারতে ঢুকেছিল। তারপর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে অবৈধভাবে বসবাস করছিল। এবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের চিহ্নিত করে পুলিসের হাতে তুলে দেওয়ার নির্দেশ দিতেই, তাঁদের দেশে ফেরার তোড়জোড় শুরু। কারণ, দেশে ফিরতে না পারলেই ঠাঁই হবে হোল্ডিং সেন্টারে।
কী এই হোল্ডিং সেন্টার?
রাজ্যে অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশিদের 'ডিটেক্ট' করে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় 'আটকে' রাখতেই হোল্ডিং সেন্টার। ডিটেনশন ক্যাম্পের আদলে জেলায় জেলায় হোল্ডিং সেন্টার তৈরির নির্দেশিকা জারি করেছে রাজ্য সরকার। যেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের পর যাঁরা অবৈধভাবে কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে এদেশে ঢুকেছে, তাঁদের 'ডিটেক্ট' বা চিহ্নিত করে এই হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হবে। হোল্ডিং সেন্টারে রাখার পর তাদের 'ডিপোর্ট' বা পুশব্যাক করা হবে।
হোল্ডিং সেন্টারই কি ডিটেনশন ক্যাম্প? সরকারের কী পরিকল্পনা?
অবৈধভাবে বসবাসকারী-অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশিদের রাখতে সরকার 'হোল্ডিং সেন্টার' তৈরির নির্দেশ দেওয়ার পরই প্রশ্ন উঠছে, হোল্ডিং সেন্টারগুলো কি ডিটেনশন সেন্টারের মতোই কাজ করবে? এই বিষয়ে সরকারের কী পরিকল্পনা? প্রসঙ্গত, ২০২৫-এর ২ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক অনুপ্রবেশকারী- অবৈধভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের শনাক্তকরণ, আটক ও প্রত্যর্পণের জন্য নতুন নির্দেশিকা জারি করলেও, পূর্বতন তৃণমূল সরকার রাজ্যে সেই নির্দেশ কার্যকর করেনি। এবার বাংলায় প্রথমবার ক্ষমতায় এসে বিজেপি সেই নির্দেশ কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট- 3D নীতির ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
সূত্রের খবর, সেই মর্মে বিভিন্ন জেলার কৃষক মান্ডি বা স্কুলগুলোকেই আপাতত 'হোল্ডিং সেন্টার' করা হচ্ছে। ডিটেনশন সেন্টারের মতো এখানে অবশ্য আলাদা কোনও ঘেরাটোপ থাকবে না। তবে যাঁরা ওই হোল্ডিং সেন্টারে থাকবেন, তাঁরা বাইরে অবাধে হাঁটাচলা করতে পারবেন না। এরপর তাদের পরিচয় যাচাই করে তাদের ফেরত পাঠানো হবে।

ডিটেনশন সেন্টারের মতো কীভাবে কাজ করবে হোল্ডিং সেন্টারগুলি?
হোল্ডিং সেন্টারগুলিতে আটক ব্যক্তিদের বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হবে। চিহ্নিত হওয়া অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের আঙুলের ছাপ ও মুখের ছবি সম্বলিত বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করে রাখা হবে। সেইসব তথ্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের ফরেইনার্স আইডেন্টিফিকেশন পোর্টালে (FIP)-এ আপলোড করা হবে। অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের ডিটেক্ট ও ডিপোর্টের জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স (STF) গঠন করার কথাও বলা আছে কেন্দ্রের নির্দেশিকায়। অর্থাৎ, ঘেরাটোপ না থাকলেও, হোল্ডিং সেন্টারগুলি এক অর্থে ডিটেনশন সেন্টারের মতোই কাজ করবে। যেখান থেকে সরাসরি ডিপোর্ট করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর স্পষ্ট নির্দেশ, অবৈধ বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের আটক করার পর পুলিসকে আর কোনও আইনি প্রক্রিয়া যেতে হবে না। রাজ্য পুলিস সরাসরি আটক অবৈধ অভিবাসীদের বিএসএফ-এর কাছে হস্তান্তর করতে পারবে। এরপর বিএসএফ তাদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য বর্ডার গার্ডস বাংলাদেশের (বিজিএফ) সঙ্গে যোগাযোগ করবে।
আর যদি কোনও সন্দেহভাজন ব্যক্তি নিজেকে ভারতীয় বলে দাবি করেন, তবে আটক ব্যক্তির তথ্য যাচাইয়ের জন্য সেই রাজ্য বা জেলার কাছে পাঠাতে হবে। ৩০ দিনের মধ্যে সেই তথ্য যাচাই করে প্রশাসনের কাছে জমা দিতে হবে। ততদিন পর্যন্ত সন্দেহভাজন ব্যক্তি ওই হোল্ডিং সেন্টারেই থাকবেন। আর যদি অবৈধ প্রমাণিত হন, তবে তাঁকে ব্ল্যাকলিস্ট করে তাঁর সমস্ত তথ্য আধার, নির্বাচন কমিশন, পাসপোর্ট ও অন্যান্য বিভিন্ন সরকারি কর্তৃপক্ষকে দেওয়া হবে। যাতে অভিযুক্তের সমস্ত পরিচয়পত্র বাতিল হয়ে যায়।

