জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো:শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষাক্রমের যোগ্যতা নির্ধারণে শিক্ষক যোগ্যতা অর্জন পরীক্ষা বা টেট (TET) এবং কেন্দ্রীয় টেট (CTET) নিয়ে শিক্ষাসংক্রান্ত নানা স্তরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা প্রশ্ন ও বিভ্রান্তি ঘুরপাক খাচ্ছিল। বিশেষ করে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও এই পরীক্ষা উত্তীর্ণ হওয়া বাধ্যতামূলক কি না, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে স্পষ্ট ধারণার অভাব ছিল।
অবশেষে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের লিখিত জবাবের পর এই জাতীয় নীতি ও বিধিমালা চূড়ান্তভাবে স্পষ্ট হয়েছে।
১. কেন্দ্র ও জাতীয় শিক্ষক শিক্ষা পরিষদ (NCTE)-এর অন্তর্গত ২২ জুলাই ২০২৬ তারিখে দেশের রাজ্যসভায় উত্থাপিত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জয়ন্ত চৌধুরী এই বিষয়ে সরকারি দৃষ্টিভঙ্গি বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, শিক্ষক নিয়োগ সংক্রান্ত বিষয়ে জাতীয় শিক্ষক শিক্ষা পরিষদ (NCTE)-এর নিয়মাবলীই কার্যকর ও বলবৎ রয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী:
প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি: শুধুমাত্র প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানকারী শিক্ষকদের জন্য টেট (TET) অথবা সিটেট (CTET) বাধ্যতামূলক।
উচ্চতর শিক্ষা স্তর: নবম-দশম শ্রেণি, একাদশ-দ্বাদশ (উচ্চমাধ্যমিক), কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় স্তরের শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে টেটের কোনও বাধ্যবাধকতা নেই।
প্রযোজ্য বিধি: নবম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় স্তর পর্যন্ত শিক্ষক ও শিক্ষক-অধ্যাপক নিয়োগ সংশ্লিষ্ট সেবা বিধি, সংবিধিবদ্ধ নিয়ম এবং বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর নির্ধারিত গাইডলাইন ও মানদণ্ড অনুসরণ করেই সম্পন্ন হবে।
২. পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট
কেন্দ্রের এই ঘোষণার মাধ্যমে জাতীয় নীতি পরিষ্কার হলেও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে প্রশাসনিক এবং বাস্তব রূপায়ণের ক্ষেত্রে জটিলতা পুরোপুরি মেটেনি। এর মূল কারণ রাজ্যের শিক্ষা পরিকাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত 'নরমাল সেকশন'।
পশ্চিমবঙ্গের বহু জুনিয়র হাই ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে একই শিক্ষককে প্রাথমিকের পর থেকে অর্থাৎ পঞ্চম/ষষ্ঠ থেকে শুরু করে নবম বা দশম শ্রেণি পর্যন্ত নিয়মিত ক্লাস নিতে হয়। এই কাঠামোর কারণে কিছু জটিল আইনি ও প্রশাসনিক প্রশ্ন সামনে এসেছে:
১. আইনি অমিল: কলকাতা হাই কোর্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ রায়ে 'নরমাল সেকশন'-এর শিক্ষকদের জোরপূর্বক আপার প্রাইমারি বা নিম্ন স্তরে নামিয়ে আনার প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করা হয়েছিল।
অন্যদিকে, দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্টের রায়ে এই সুনির্দিষ্ট কাঠামোটি নিয়ে পৃথক কোনও বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
২. প্রয়োগের সংশয়: একজন শিক্ষক যদি একই সঙ্গে অষ্টম শ্রেণি (যার জন্য টেট বাধ্যতামূলক) এবং নবম-দশম শ্রেণি (যার জন্য টেট প্রয়োজন নেই) উভয় স্তরেই পাঠদান করেন, তবে তাঁর ক্ষেত্রে সরকারি টেট নীতি ঠিক কীভাবে প্রযোজ্য হবে-- তা নিয়ে শিক্ষকমহলে তীব্র ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।
জাতীয় স্তরে নবম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষকতার জন্য অতিরিক্ত টেটের প্রয়োজনীয়তা খারিজ করে দিলেও, পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক কাঠামো ও নরমাল সেকশনের জটিলতার কারণে বিষয়টি এখনও আটকে রয়েছে।
শিক্ষক ও শিক্ষা অনুরাগী মহলের মতে, রাজ্য শিক্ষা দফতর খুব দ্রুত এই বিষয়ে পৃথক প্রাতিষ্ঠানিক নির্দেশিকা (Circular) প্রকাশ না করলে শিক্ষক পদমর্যাদা ও দায়িত্ব বণ্টন সংক্রান্ত এই বাস্তব সমস্যার চূড়ান্ত অবসান সম্ভব নয়।

