অর্ণবাংশু নিয়োগী: পুলিসের পর এবার রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের (AITC) ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ওপর বড় থাবা কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ED)। আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইন (PMLA), ২০০২-এর আওতায় কলকাতার জোনাল অফিসের আধিকারিকরা কলকাতা এবং সংলগ্ন এলাকার মোট ৫টি জায়গায় ম্যারাথন তল্লাশি অভিযান চালিয়েছেন।
এই অভিযানের পরেই এইচডিএফসি (HDFC) ব্যাংকে থাকা তৃণমূল কংগ্রেসের ৩টি অ্যাকাউন্টের মোট ৪৪০.৪২ কোটি টাকা ফ্রিজ বা লেনদেন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে জানা গিয়েছে, তৃণমূল কংগ্রেসের মোট ১২টি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যার মধ্যে ৭টি অ্যাকাউন্ট পুরোপুরি সচল বা অপারেশনাল ছিল। এর মধ্যে ২ থেকে ৩টি অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে একটি বেসরকারি বিমান সংস্থার সাথে বিপুল অঙ্কের টাকা লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে। এই অ্যাকাউন্টগুলিই মূলত ফ্রিজ করেছে ইডি।
তদন্তের সূত্রপাত
ইডি জানিয়েছে, বিধাননগর সাইবার ক্রাইম থানায় দায়ের হওয়া একটি এফআইআর (FIR)-এর ওপর ভিত্তি করে এই আর্থিক কেলেঙ্কারির তদন্ত শুরু হয়। অভিযোগ ছিল, বেআইনিভাবে অর্থ সংগ্রহ, অসাধু উপায়ে আর্থিক কারচুপি এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে অত্যন্ত সন্দেহজনকভাবে বিপুল পরিমাণ টাকা লেনদেন করা হয়েছে।
বিলাসবহুল বিমান ও হেলিকপ্টার ক্রয়
ইডির তদন্তে উঠে এসেছে অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর কিছু তথ্য। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাস থেকে ২০২৬ সালের জুন মাসের মধ্যে তৃণমূলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা পাঠানো হয়েছিল 'কেয়ারওয়েল অ্যাভিয়েশন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড' (Carewell Aviation India Pvt Ltd) এবং তার সহযোগী বিমান পরিবহণ সংস্থাগুলিতে।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ে আরও ৮২.৯৬ কোটি টাকা একটি নতুন সহযোগী সংস্থায় ট্রান্সফার করা হয়। ইডির অভিযোগ, এই বিপুল অর্থ দিয়ে একটি বিলাসবহুল 'Embraer Legacy 600' বিমান এবং একটি 'Agusta 109 Grand New' হেলিকপ্টার কেনা হয়েছে। এই দুটি উড়ানযান কেনার পেছনে সব মিলিয়ে মোট ১১২ কোটি টাকা খরচ করা হয়েছে বলে ইডির দাবি।
বিদেশি ঋণ ও লেনদেন
এই তদন্তে আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের যোগসূত্রও খুঁজে পেয়েছে ইডি। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালে 'কেম্যান আইল্যান্ডস' (Cayman Islands) নামক একটি বিদেশি সংস্থা থেকে ১৭ লক্ষ মার্কিন ডলার (যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১৪ কোটি টাকার কাছাকাছি) অসুরক্ষিত ঋণ (Unsecured Loan) নেওয়া হয়েছিল।
সবচেয়ে অদ্ভুত বিষয়, ইডির দাবি অনুযায়ী, তৃণমূল কংগ্রেসের তহবিল থেকে পাঠানো টাকাতেই প্রথমে ওই বিমান ও হেলিকপ্টার কেনা হয়। এরপর সেগুলি ঘুরপথে তৃণমূল কংগ্রেসকেই নির্বাচনী প্রচার বা অন্য কাজের জন্য ভাড়া দেওয়া হত। বিমান এবং হেলিকপ্টার ব্যবহারের নাম করে এরপরেও কোটি কোটি টাকার সন্দেহজনক আদান-প্রদান চলেছে।
কেন্দ্রীয় এই তদন্তকারী সংস্থা স্পষ্ট জানিয়েছে, এই জটিল এবং বিশাল আর্থিক লেনদেনের নেপথ্যে প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল এবং এর আসল সুবিধাভোগী (Beneficial Purpose & Beneficiary) কারা, তা সম্পূর্ণরূপে খতিয়ে দেখতেই এই কড়া পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। শাসক দলের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং সাড়ে চারশো কোটি টাকা আটকে দেওয়ার এই ঘটনায় স্বভাবতই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র তোলপাড় শুরু হয়েছে।

