জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: পশ্চিমবঙ্গে যখন রাজ্য রাজনীতিতে তোলপাড় পরিস্থিতি। তখন অন্যদিকে, বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি দল থেকে পদত্যাগ করেছেন। এই নিয়ে বেশ শোরগোল শুরু হয়েছে। জানা গিয়েছে, তামিলনাড়ুর বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি এবং প্রাক্তন আইপিএস (IPS) অফিসার কে. আন্নামালাই দিল্লিতে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি নিতিন নবীনের সঙ্গে দেখা করে তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন।
আজই কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গেও তাঁর বৈঠক করার কথা রয়েছে। এমনকী এও শোনা যাচ্ছে যে, আন্নামালাই নিজের দল গড়তে চলেছেন।
কেন পদত্যাগ করলেন আন্নামালাই?
দীর্ঘদিন ধরে তামিলনাড়ুতে বিজেপির প্রধান মুখ ছিলেন আন্নামালাই। সবাই তাঁকে দলের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখছিল। কিন্তু তাঁর এই আচমকা দল ছাড়ার সিদ্ধান্তের পেছনে গভীর কারণ রয়েছে। জানা যায়, দীর্ঘদিন ধরেই আন্নামালাইয়ের সঙ্গে বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের নীতিগত মতবিরোধ চলছিল বলে খবর। বিশেষ করে সম্প্রতি ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। এই নির্বাচনে টিকিট বন্টন এবং দলের রণকৌশল নিয়ে আন্নামালাইয়ের মনে তীব্র ক্ষোভ ছিল। ২০২৬ সালের তামিলনাড়ু বিধানসভা নির্বাচনে অল ইন্ডিয়া আন্না দ্রাবিড় মুনেত্র কাড়াগাম (AIADMK)-এর সঙ্গে বিজেপির জোট করা আন্নামালাই একেবারেই পছন্দ করেননি। তিনি চেয়েছিলেন বিজেপি একা লড়াই করে রাজ্যে নিজেদের সংগঠন শক্তিশালী করুক।
Court Viral আদালত চত্বরে ৫০০-র নোটের বৃষ্টি! টাকা কুড়োতে ব্যাপক হুড়োহুড়ি
কিন্তু কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ডিএমকে (DMK)-কে হারানোর লক্ষ্যে এআইএডিএমকে-র সঙ্গে জোটে বেশি জোর দেয়। এরপর থেকে দলে তাঁর গুরুত্ব কমে আসছিল এবং সম্প্রতি তামিলনাড়ুর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপি মাত্র একটি আসনে জয়লাভ করায় তাঁর ওপর অসন্তোষ বাড়ে। এছাড়া নবম শ্রেণীর শিক্ষার্থীদের জন্য কেন্দ্রের ত্রি-ভাষা নীতি কার্যকর করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেও আন্নামালাই প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছিলেন।
আরও জানা গিয়েছে, বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁকে দলে ধরে রাখতে চেয়েছিল। তাঁকে একাধিক বড় পদের অফার দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আন্নামালাই তাঁর সবকটি প্রস্তাব বিনম্রভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে জানা গিয়েছে, তিনি একটি নতুন দল গঠন করবেন। এই দল তামিলনাড়ুর চেনা 'দ্রাবিড়ীয় রাজনীতি'র তীব্র বিরোধিতা করবে। আন্নামালাইয়ের নতুন দল সম্পূর্ণ 'জাতীয়তাবাদী' আদর্শ নিয়ে কাজ করবে।
জোট বিতর্ক এবং দিল্লির সঙ্গে দূরত্বের শুরু
আন্নামালাইয়ের লক্ষ্য ছিল অনেক দূরের। তিনি তামিলনাড়ুর প্রধান দুই দ্রাবিড় দল ডিএমকে (DMK) এবং এআইএডিএমকে (AIADMK)-এর বিকল্প তৈরি করতে চেয়েছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন বিজেপি যেন নিজের শক্তিতে একা দাঁড়ায়। এই কারণে তিনি বিরোধী দল AIADMK-এর কড়া সমালোচনা শুরু করেন। তিনি তামিল রাজনীতির দুই প্রয়াত বড় নেতা সি এন আন্নাদুরাই এবং জে জয়ললিতার বিরুদ্ধে কিছু বিতর্কিত মন্তব্য করেন। এই মন্তব্যের কারণে AIADMK নেতৃত্ব খুব রেগে যায়। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, আন্নামালাই ক্ষমা না চাইলে তারা বিজেপির সঙ্গে কোনও জোট রাখবে না। আন্নামালাই ক্ষমা চাননি। তাই ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি একলা লড়াই করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফলাফল প্রকাশের পর দেখা যায়, বিজেপির ভোট অনেক বেড়েছে। কিন্তু দল একটি আসনও জিততে পারেনি। কোয়েম্বাটুর আসন থেকে আন্নামালাই নিজে দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি ডিএমকে প্রার্থীর কাছে ১৭,৮০০-র বেশি ভোটে হেরে যান। এর আগে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনেও তিনি আরাভাকুরিচি আসন থেকে হেরেছিলেন। এই জোড়া পরাজয়ের পর দিল্লির বিজেপি নেতৃত্ব চিন্তায় পড়ে যায়। তারা মনে করতে শুরু করে যে, আন্নামালাইয়ের জনপ্রিয়তা যতই থাকুক না কেন, AIADMK-র মতো বড় আঞ্চলিক দল ছাড়া তামিলনাড়ুতে জেতা সম্ভব নয়।
যেভাবে বিজেপির 'সিংঘম' হয়ে উঠেছিলেন আন্নামালাই
কে আন্নামালাই আগে কর্নাটক পুলিসে কাজ করতেন। তিনি অত্যন্ত সৎ এবং কড়া মেজাজের অফিসার ছিলেন। এই কারণে সবাই তাঁকে 'সিংঘম' নামে ডাকত। ২০২১ সালে তিনি চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে আসেন। তিনি তামিলনাড়ু বিজেপির রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব নেন। এর পর থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি রাজ্যে বিজেপির জন্য দিনরাত এক করে কাজ করেছেন। তামিলনাড়ুর মানুষ এতদিন বিজেপিকে 'হিন্দি বলয়ের দল' বা বহিরাগত ভাবত। সেখানে বিজেপি কোনও পাত্তাই পেত না। কিন্তু আন্নামালাই এসে পুরো চেনা ছকটাই বদলে দেন। তিনি খুব আক্রমণাত্মক প্রচার শুরু করেন।
তিনি শাসকদল ডিএমকে (DMK) সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন করেন। তাঁর দুর্নীতি-বিরোধী লড়াই সাধারণ মানুষের মন জয় করে নেয়। তিনি মানুষের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করতে পেরেছিলেন। তাঁর এই লড়াইয়ের বড় ফল দেখা যায় ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে। সেই নির্বাচনে তামিলনাড়ুতে বিজেপির ভোট শেয়ার একলাফে বেড়ে ১১.২% হয়ে যায়। এর আগে ২০১৯ সালে এই ভোট শেয়ার ছিল মাত্র ৩.৬%। রাজ্যের ইতিহাসে এটিই ছিল বিজেপির সবথেকে ভালো পারফরম্যান্স।
বিস্ফোরক আন্নামালাই
দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে আন্নামালাই সরাসরি দল ছাড়ার গুঞ্জন অস্বীকার করেননি। বরং তিনি রহস্য বজায় রেখে বলেন, 'দয়া করে অপেক্ষা করুন। আমরা দুই দিনের মধ্যে একসঙ্গে বসে বিস্তারিত কথা বলব।'
অন্যদিকে, তামিলনাড়ুর কোয়েম্বাটুরে তাঁর সমর্থকেরা ইতোমধ্যেই চারদিকে বড় বড় পোস্টার লাগাতে শুরু করেছেন। সেই পোস্টারে লেখা হয়েছে- 'আমাদের নেতা, আসুন এবং আমাদের পথ দেখান।' রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আন্নামালাই হয়তো বিজেপি ছেড়ে নিজের একটি নতুন রাজনৈতিক দল তৈরি করতে পারেন।আন্নামালাইয়ের এই পদত্যাগ তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে বিজেপির জন্য বড় ধাক্কা এবং রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণে এক নতুন মোড় আনতে চলেছে।

