মৌমিতা চক্রবর্তী
সোনারপুর অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে জনরোষ আছড়ে পড়ার পর রাজ্য বিজেপির সভাপতি লম্বা তালিকা দিয়েছিলেন কীভাবে রাজ্যজুড়ে বিজেপির নেতা কর্মীদের উপরে হামলা হয়েছে তৃণমূলের আমলে। সেই তালিকায় রয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী, দলের নেতা সুকান্ত মজুমদার, তত্কালীন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জে পি নাড্ডা, দলের নেতা দিলীপ ঘোষ, শমীক ভট্টাচার্যরা।
পাশাপাশি তালিকায় রয়েছেন জেলায় জেলায় বিজেপির সাধারণ নেতা কর্মীরাও।
দেড় দশক আগে সিপিএমকে গদিচ্যুত করে ক্ষমতায় আসে তৃণমূল কংগ্রেস। রাজ্যের ক্ষমতা হাতে নিয়ে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন বদল নয় বদলা চাই। তার পরেও আক্রান্ত হয়েছিলেন খোদ বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র, মহম্মদ সেলিম, ঐশী ঘোষ, গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জি, দেবলীনা হেমব্রম, খগেন মুর্মুরা। পাশাপাশি রয়েছে সিপিএমের কর্মী সমর্থকরা।
দেবলীনা হেমব্রম, গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জী উপরে হামলা হয় বিধানসভায় ২০১২-র ১২ ই ডিসেম্বর। বিধানসভার মধ্যে দেবলীনা হেমব্রমকে পাঁজাকোলে করে তুলে নিয়ে আছড়ে ফেলা হয়েছিল। চুলের মুঠি ধরে মারা হয়েছিল। এমনটাই দাবি সিপিএমের। গৌরাঙ্গ চ্যাটার্জির হাড়ে চিড় ধরেছিল। সারদার চুরি নিয়ে প্রশ্ন করায় ওই আক্রমণ শিকার হতে হয় তাঁদের। সেদিন শাসকের নির্দেশে কলকাতার কোনও হাসপাতাল আহত বামপন্থী বিধায়কদের ভর্তি নিতে চায়নি। অভিষেকের ক্ষেত্রে গতকাল রাতে এই অভিযোগটাই করতে চাইলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
কাশীপুরে বামেদের একটি মিছিলে যোগ দেন বিমান বসু। সেখানে বিমান বসুর গাড়িতে হামলা চালানো হয়। এমনকি বিমান বসুর উপরেও হামলার ঘটনা ঘটেছিল। ২০১৩ সালে নারায়ণগড়ে সূর্যকান্ত মিশ্রর উপরে হামলার ঘটনা ঘটে। ২০২০ সালে দুর্গাপুরে সিপিএমের মিছিলে হামলা হয়। মাথা ফাটে ঐশী ঘোষের। সেইসময় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, মাথায় একটা বাড়ি পড়েছে তাতেই এত কথা! এত রাজনীতি!
২০১৮ পঞ্চায়েত নির্বাচনের নমিনেশন জমা দিতে যাওয়ার অপরাধে খানাকূলে ব্লক অফিসের সামনেই মহিলা সিপিএম সদস্যকে চুলের মুটি ধরে মারধোর করা হয়। বীরভূমে রামচন্দ্র ডোমের মেরে মাথা ফাটিয়ে দেওয়া হয়। মুর্শিদাবাদে সেলিমকে ঘিরে ধরে ধাক্কাধাক্কি করা হয়।
চার বারের বিধায়ক ধীরেন লেট তাঁর নিজের এলাকাতেই লাঞ্ছিত হন। ২০১৫ সালের ২৩ নভেম্বরের ঘটনা। বীরভূমের ময়ূরেশ্বরের ঘটনা। একটি জাঠায় যোগ দিয়ে ময়ূরেশ্বরের গড়গড়া থেকে ষাটপলশা পৌঁছনোর মুখে, তখনই হামলা হয়। গোডাউন মোড়ের কাছে ধীরেন লেটের উপরে হামলা হয়। মার খেয়ে পড়ে যান জেলা কমিটির সদস্য অরূপ বাগ। ধীরেনবাবুর দাবি, তাঁর মাথার বাঁদিকে কাঠ দিয়ে মারা হয়। পাশাপাশি চলতে থাকে লাঠি, কিল , ঘুসি। শরীর থেকে জামা গেঞ্জি টেনে খুলে নিয়ে নগ্ন করার চেষ্টা করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হলে মাথায় অন্তত ৩০টি সেলাই পড়ে।
বেলভিউ থেকে বাড়িতেই ফিরলেন অভিষেক, মমতা বললেন হাসপাতালকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল
তৃণমূল আমলে বিজেপি নেতা কর্মীদের উপরে একের পর এক হামলার ঘটনা ঘটে। এক্ষেত্রে বাদ পড়েননি বিজেপির তত্কালীন সর্বভারতীয় সভাপতি ডে পি নাড্ডা থেকে শুরু করে রাজ্যের নেতা শুভেন্দু অধিকারী, সুকান্ত মজুমদার, শমীক ভট্টাচার্যরা।
২০২০ সালে ডায়মন্ডহারবার যাওয়ার পর শিরাকোলে হামলার মুখে পড়ে জে পি নাড্ডার কনভয়। ইটের আঘাত তাঁর গাড়ির কাচ ভেঙে যায়। আমতলা থাকে শিরাকোল পর্য়ন্ত দফায় দফায় বিক্ষোভের মুখে পড়ে জে পি নাড্ডা, কৈলাশ বিজয়বর্গীয়দের কনভয়। পাথর ছোড়া হয় কৈলাশ বিজয়বর্গীয়র গাড়িতেও। উড়ন্ত বোতলের ঘায়ে দিলীপ ঘোষের গাড়ির কাচ ভেঙে আহত এক নিরাপত্তাকর্মী।
উত্তরবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ হয়। গতকাল শমীক ভট্টাচার্য দাবি করেন, উত্তরবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর গাড়ির উপরে হামলা চালানো হয়। গাড়ির মধ্যেই তাঁকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়। ২০২৫ সালের ৫ অগস্ট কোচবিহারের খাগরাবাড়ির কাছে হামলা চালানো হয় শুভেন্দুর কনভয়ে। সেই ঘটনার বছরখানেক পর গ্রেফতার বলেন অভিযুক্তেরা। গত ১১ জানুয়ারি পুরুলিয়ায় দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে বাড়ি ফেরার সময় শনিবার সন্ধ্যায় চন্দ্রকোনায় তাঁর গাড়িতে হামলা হয় বলে অভিযোগ । প্রায় এক ঘণ্টা ধরে তৃণমূলের কর্মীরা দলীয় পতাকার পাশাপাশি বাঁশ ও লাঠি নিয়ে তাঁর গাড়িতে চড়াও হলেও পুলিস আসেনি বলে দাবি শুভেন্দুর। এরকম একাধিকবার হামলা হয় শুভেন্দু অধিকারীর উপরে।
উল্লেখ্য, গতকাল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে হামলার পর গত কয়েক বছরে বিজেপির নেতা কর্মীদের উপরে কীভাবে একের পর এক হামলা হয়েছে তা তুলে ধরেন রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। সংবাদমাধ্যমে শমীক বলেন, ছেলে ভাত খাচ্ছে, মায়ের সামনে ছেলেকে গুলি করে খুন করা হয়েছে। মহিলাদের মাথা ন্যাড়া করে তাকে দিয়ে থুতু চাঁটানো হয়েছে। নৈহাটিকে বিজেপি করার জন্য পুরুষকে উলঙ্গ করে তাতে থুতু চাঁটানো। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়ে বিজেপি প্রার্থীকে। অত্যাচার কিছু বাদ রেখেছে? সন্তোষ ট্রফি খেলা একজন ফুটবলার, স্যুইগির জিনিসপত্র সাপ্লাই করে জীবন ধারন করেন, তাঁকে বিজেপির বুথে বসার জন্য তাঁর নথ সাঁড়াশি দিয়ে উপড়ে নেওয়া হয়েছিল। আজ যদি তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসত তাহলে আজ আমি এই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারতাম না। আমাদের ৫০০ কর্মী খুন হয়ে যেত। যদি কংগ্রেস বা সিপিএম হত তাহলে আজকে তিনি বিবৃতি দেওয়ার অবস্থায় থাকতেন না। অনেক আগেই লিনচিংয়ের শিকার হয়ে যেতেন। যে অত্যাচার দক্ষিণ ২৪ পরগনায় হয়েছে, তিনটে সভাপতির গাড়ি ভাঙা হয়েছে। অকারণে মারধর করা হয়েছে মানুষকে। আমাদের জেলা সভাপতির কোমর চিরকালের মতো নষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। রুপা গঙ্গোপাধ্যায় তখন আমাদের মহিলা শাখার সভানেত্রী ছিলেন। কী করা হয়েছিল রূপা গাঙ্গুলীর সঙ্গে? এসব রাজনীতিতে আর চলবে না। শান্ত থাকুন। প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের কর্মীরা ভদ্রভাবে আচরণ করুন। হিংসা বর্জন করুন। মানুষের আবেগকে মর্যাদা দিয়ে এই ধরনের কাজকর্ম থেকে বিরত থাকুন।

