অনুপ কুমার দাস: কবিতার একটি পংক্তি ঘিরে আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছিলেন প্রখ্যাত কবি ও গীতিকার শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই মামলার জেরে কৃষ্ণনগর জেলা আদালত তাঁর ওপর একাধিক বিধিনিষেধ আরোপ করেছিল, যার মধ্যে অন্যতম ছিল কলকাতার বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে আইনি নিষেধাজ্ঞা। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তাঁর পেশাগত ও সামাজিক জীবনের গতি কিছুটা হলেও রুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।
তবে আজ, কৃষ্ণনগর জেলা আদালতের এক ঐতিহাসিক রায়ে মিলল বড়সড় আইনি স্বস্তি। কাজের প্রয়োজনে রাজ্যের বাইরে এমনকি দেশের অন্য প্রান্তেও সফরের অনুমতি পেলেন তিনি।
ঘটনার সূত্রপাত শ্রীজাতর লেখা একটি কবিতার লাইনকে কেন্দ্র করে। উক্ত পংক্তিটি সামাজিক ও আইনি পরিমণ্ডলে বিতর্ক সৃষ্টি করলে কৃষ্ণনগর জেলা আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করা হয়। সেই মামলার শুনানি চলাকালীন আদালত তাঁকে জামিন দিলেও কিছু কঠোর শর্ত আরোপ করে। নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তিনি আদালতের অনুমতি ছাড়া কলকাতার ভৌগোলিক সীমানার বাইরে যেতে পারবেন না। একজন পেশাদার কবি, সাহিত্যিক ও গীতিকারের ক্ষেত্রে এই ধরনের আইনি বাধ্যবাধকতা কতখানি প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
অসমের বন্যায় বন্দি মা, ভেসে গেছে ঘরবাড়ি: কান্না
সম্প্রতি শ্রীজাতর পেশাগত জীবনে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজের সুযোগ আসে। মুম্বই এবং হায়দরাবাদের মতো বিনোদন ও শিল্প জগতে একের পর এক গান ও সংলাপ লেখার ডাক পান তিনি। গান ও সাহিত্যের কাজ কেবল তাঁর মানসিক খোরাক নয়, তাঁর প্রধান পেশাও বটে। ফলে এই কাজের তাগিদেই কৃষ্ণনগর জেলা আদালতে হাজির হয়ে নিজ জামিনের শর্ত শিথিল করার আবেদন জানান শ্রীজাত। তাঁর আইনি দল আদালতে সওয়াল করে জানান, পেশাগত দায়িত্বে সফলভাবে অংশ নিতে এবং কাজের প্রয়োজনে রাজ্য ছাড়ার জন্য শ্রীজাতকে ছাড়পত্র দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আজ কৃষ্ণনগর জেলা আদালতে বাদি ও বিবাদী-উভয় পক্ষের আইনজীবীই তাঁদের স্বপক্ষে একাধিক যুক্তি তুলে ধরেন। বাদি পক্ষ মামলার সংবেদনশীলতার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কঠোরতা বজায় রাখার অনুরোধ জানালেও, বিবাদী পক্ষের আইনজীবী যুক্তি দেন যে, শ্রীজাত একজন সম্মানিত সাহিত্যিক এবং তিনি বিগত দিনে আদালতের সমস্ত নির্দেশ ও জামিনের শর্ত সম্পূর্ণ অনুগত হয়ে মেনে চলেছেন। তদন্ত প্রক্রিয়ায় বা আইনি কার্যক্রমে তিনি কখনও কোনো অসহযোগিতা করেননি।
উভয় পক্ষের দীর্ঘ বক্তব্য ও যুক্তিসমূহ গভীর মনোযোগের সঙ্গে পর্যালোচনা করেন মহামান্য বিচারক। সেই সঙ্গে মামলার নথিপত্র এবং অভিযুক্তের সাম্প্রতিক ইতিবাচক বিচার বিভাগীয় আচরণ গভীরভাবে বিবেচনা করা হয়। সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে কৃষ্ণনগর জেলা আদালত পর্যবেক্ষণ করে যে, একজন নাগরিকের পেশাগত অধিকার এবং আদালতের প্রতি তাঁর আনুগত্যকে সম্মান জানানো প্রয়োজন। ফলস্বরূপ, আদালতের পক্ষ থেকে শ্রীজাতর জামিনের পূর্ববর্তী শর্ত শিথিল করার আদেশ দেওয়া হয়।
আদালতের নতুন নির্দেশিকা অনুযায়ী, ১ ডিসেম্বর ২০২৬ তারিখ পর্যন্ত শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের ওপর পূর্বের কড়া আইনি বিধিনিষেধ বলবৎ থাকবে না। এই সময়ের মধ্যে কৃষ্ণনগর আদালতের এখতিয়ারভুক্ত এলাকা এবং নিজ বাসস্থানের এখতিয়ারের বাইরে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁকে আর আদালতের থেকে আগাম লিখিত অনুমতি নিতে হবে না। অর্থাৎ, কাজের প্রয়োজনে তিনি অনায়াসে মুম্বই, হায়দরাবাদ বা দেশের অন্য যেকোনো প্রান্তে যাতায়াত করতে পারবেন।
তবে, এই শর্ত শিথিলের পাশাপাশি কৃষ্ণনগর জেলা আদালত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত শর্ত আরোপ করেছে। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, এই মামলায় যখনই অভিযোগ গঠন করা হবে, কিংবা বিচারপ্রক্রিয়ার স্বার্থে আদালত যখনই তাঁকে হাজির হওয়ার জন্য নোটিস দেবে, তখন শ্রীজাতকে অবশ্যই ব্যক্তিগতভাবে আদালতে সশরীরে উপস্থিত থাকতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এই হাজিরার নিয়ম লঙ্ঘন করা যাবে না। আদালতের পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এই নতুন আদেশ ও শর্তাবলি কঠোরভাবে বলবৎ থাকবে।
বাংলা ছবিতে নতুন রসায়ন! প্রথমবার সৃজিতের সুরে...
ঘটনার সূত্রপাত ২০১৭ সালে। যোগী আদিত্যনাথ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর শ্রীজাত তাঁর ফেসবুক পেজে 'অভিশাপ' নামে একটি কবিতা পোস্ট করেছিলেন। অভিযোগ ওঠে, ওই কবিতার ছত্রে ছত্রে হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত করা হয়েছে। এমনকি কবিতার একটি নির্দিষ্ট লাইনে শিবলিঙ্গ নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করারও অভিযোগ তোলে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলি। এই ঘটনার জেরে সেই সময় তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়, কবিকে প্রাণে মারার হুমকি পর্যন্ত দেওয়া হয় এবং ফেসবুক থেকে কবিতাটি সরিয়েও নেওয়া হয়েছিল।
পরবর্তীকালে, ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটের প্রাক্কালে এই ইস্যুতে কৃষ্ণনগর আদালতের দ্বারস্থ হন আইনজীবী রোমিত শীল। আদালতের তরফে কবিকে একাধিকবার সমন পাঠানো হলেও তিনি নির্ধারিত সময়ে হাজিরা দেননি বলে অভিযোগ। ফলস্বরূপ, দীর্ঘ কয়েক বছর পর গত ২০ এপ্রিল শ্রীজাতর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে আদালত।

