জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: ভারতের অপরাধ দমনের ইতিহাসে 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' পুলিস কর্মকর্তাদের ভূমিকা সবসময়ই যেমন চর্চিত, তেমনই বিতর্কিত। বিশেষ করে ৯০-এর দশকে মুম্বাই আন্ডারওয়ার্ল্ড বা গ্যাংস্টারদের দাপট থামাতে এই কর্মকর্তারা এক বিশাল ভূমিকা পালন করেছিলেন। ভারতের এমন কয়েকজন শীর্ষ ও কুখ্যাত এনকাউন্টার স্পেশালিস্টের তালিকা এবং তাদের কাজের খতিয়ান।
বন্দুকের মুখে অপরাধ দমন: ভারতের শীর্ষ 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' পুলিস অফিসাররা
১. প্রদীপ শর্মা: মুম্বই পুলিসের ১৯৮৩ ব্যাচের এই কর্মকর্তা ভারতের সবচেয়ে আলোচিত এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের একজন। লখন ভাইয়া ভুয়ো এনকাউন্টার মামলা- সহ নানা বিতর্কে তার নাম জড়ালেও অপরাধ জগতে তিনি ছিলেন ত্রাস। ৩১২টিরও বেশি অপরাধীকে খতম করার অভিযানে অংশ নিয়েছেন, যার মধ্যে ১০০টিরও বেশি এনকাউন্টার তিনি নিজে সরাসরি করেছেন।
২. প্রফুল্ল ভোসলে: মুম্বই পুলিসের আন্ডারওয়ার্ল্ড দমন শাখার অন্যতম মূল চাবিকাঠি ছিলেন তিনি। প্রদীপ শর্মা ও বিজয় সালাসকরের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ৯০-এর দশকে মুম্বাইকে গ্যাংস্টারমুক্ত করার অভিযানে তিনি বড় ভূমিকা নেন। তাঁর ক্যারিয়ারে প্রায় ৮৫ জন কুখ্যাত অপরাধীকে এনকাউন্টারে খতম করার রেকর্ড রয়েছে।
৩. দয়া নায়ক: মুম্বই পুলিসের ১৯৯৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তার জীবন এতটাই রোমাঞ্চকর যে তাকে অনুপ্রাণিত করে বলিউডে 'আব তক ছপ্পন'-এর মতো সিনেমা তৈরি হয়েছে। তিনি দাউদ ইব্রাহিমের ডি-কোম্পানি ও ছোট রাজানের গ্যাংয়ের বহু শার্পশুটারকে খতম করেন। প্রায় ৮৩ জন কুখ্যাত গ্যাংস্টারকে এনকাউন্টারে খতম করেছেন তিনি।
৪. বিজয় সালাসকর: মুম্বই পুলিসের এই নির্ভীক অফিসার অরুণ গাউলি গ্যাংয়ের কোমর ভেঙে দিয়েছিলেন। দুঃখজনকভাবে, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর মুম্বাই জঙ্গি হামলায় সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি শহিদ হন। মৃত্যুর পর তাঁকে সর্বোচ্চ বীরত্ব পুরস্কার 'অশোক চক্র' দেওয়া হয়। কর্মজীবনে প্রায় ৭৫ থেকে ৮০ জন অপরাধীকে এনকাউন্টারে খতম করেন।
৫. শচীন ভিজে: মুম্বই পুলিসের ১৯৯০ ব্যাচের এই কর্মকর্তা আন্ডারওয়ার্ল্ড দমনে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে ব্যবসায়ী মুকেশ আম্বানির বাড়ির সামনে বিস্ফোরক গাড়ি উদ্ধার মামলা (অ্যান্টিলিয়া কাণ্ড) এবং ব্যবসায়ী মনসুখ হিরেন হত্যাকাণ্ডে জড়িয়ে তিনি চাকরি হারান ও গ্রেফতার হন। তিনি তাঁর পুলিস জীবনে প্রায় ৬৩ জন অপরাধীকে এনকাউন্টারে খতম করেছেন।
৬. রবীন্দ্র আংরে: মুম্বই এবং থানে সংলগ্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও মাফিয়া চক্র উপড়ে ফেলতে রবীন্দ্র আংরের নাম ডাক ছিল। থানের কুখ্যাত গ্যাংস্টার সুরেশ মাঙ্কেওকারকে খতম করে তিনি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন। তিনি তাঁর কর্মজীবনে প্রায় ৫৪টি সফল এনকাউন্টার সম্পন্ন করেছেন।
৭. আসলাম মোমিন: মুম্বই পুলিসের এই এনকাউন্টার স্পেশালিস্টও আন্ডারওয়ার্ল্ডের দাপট কমানোর ক্ষেত্রে অত্যন্ত সক্রিয় ছিলেন। তবে পরবর্তীতে মাফিয়া ডন দাউদ ইব্রাহিমের ভাই ইকবালের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের অভিযোগ ওঠায় ২০০৫ সালে তাঁকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ জন অপরাধীকে এনকাউন্টারে খতম করেছিলেন।
৮. রাজবীর সিং: দিল্লি পুলিসের ইতিহাসে একমাত্র কর্মকর্তা যিনি এসিপি পদমর্যাদায় থাকাকালীন 'এনকাউন্টার স্পেশালিস্ট' হিসেবে খ্যাতি পান। ২০০১ সালের ভারতীয় সংসদে জঙ্গি হামলা এবং ২০০০ সালের লাল কেল্লা হামলার তদন্ত ও অপরাধী দমনে তাঁর বড় ভূমিকা ছিল। ২০০৮ সালে এক সম্পত্তি বিবাদের জেরে তাঁরই এক পরিচিত ব্যক্তি তাঁকে গুলি করে হত্যা করে। তিনি দিল্লির কুখ্যাত গ্যাংস্টার ও মাফিয়াদের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০টিরও বেশি এনকাউন্টার করেছিলেন।
৯. দীপক মিশ্র: দিল্লি পুলিসের একজন অত্যন্ত সিনিয়র আইপিএস কর্মকর্তা। সরাসরি নিজে বন্দুক হাতে মাঠে নামার চেয়েও, তিনি দিল্লির বড় বড় অপরাধী চক্র ও মাফিয়া ডনদের ধরার জন্য একের পর এক সফল এনকাউন্টার ব্লু-প্রিন্ট ও অপারেশনের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য পরিচিত। তাঁর নির্দেশনায় ও নেতৃত্বে দিল্লিতে বহু কুখ্যাত অপরাধী এনকাউন্টারে খতম হয়।
১০. অমিত কুমার: তালিকায় উত্তরপ্রদেশ পুলিসের একজন অত্যন্ত কড়া অফিসার হিসেবে পরিচিত অমিত কুমার। পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের কুখ্যাত সব গ্যাং, হাইওয়ে লুটেরা এবং কন্ট্যাক্ট কিলারদের বিরুদ্ধে তিনি বহু সফল এনকাউন্টার অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাঁর দল উত্তরপ্রদেশে ১০০-র বেশি অপরাধীকে এনকাউন্টার অপারেশনের মাধ্যমে দমন করেছে।
এনকাউন্টার স্পেশালিস্টদের এই পুরো দলটিকে একসময় মুম্বইয়ে "The Lethal Squad" বা মারাত্মক দল বলা হত। ভারতের আইন অনুযায়ী এনকাউন্টার নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও আইনি লড়াই থাকলেও, সাধারণ মানুষের একটা বড় অংশ সে সময়ে আন্ডারওয়ার্ল্ডের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য এই পুলিস অফিসারদের 'হিরো' মনে করত।

