জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: প্রথম স্ত্রীর সামনেই দ্বিতীয় বিয়ে। একদমই সেটা মেনে নিতে পারেননি প্রথম স্ত্রী, কিন্তু প্রতিবাদও করতে পারেননি। দীর্ঘদিনের অশান্তি-অত্যাচার সহ্য করতে করতে একদিন সবকিছুর হাড়হিম পরিণতি ঘটে গেল। স্বামী, সতীন, বৃদ্ধ শাশুড়ি এবং এক নাবালিকা ভাইঝিকে অত্যন্ত নৃশংসভাবে খুন।
শুধু তাই নয়, খুনের পর প্রমাণ লোপাট করতে একটি গাড়ির ভেতর তাঁদের দেহ ঢুকিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি রাজস্থানের আজমের শহর থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত শ্রীরামপুরা গ্রামে।
ঘটনার সূত্রপাত
গত ২৭ মে রাতে নিহতদের বাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে হাইওয়ের ওপর একটি মহিন্দ্রা স্করপিও গাড়ি দাউদাউ করে জ্বলতে দেখা যায়। প্রথমটায় সবাই ভেবেছিলেন এটি একটি সাধারণ পথ দুর্ঘটনা এবং গাড়ির অগ্নিকাণ্ড। কিন্তু পুলিস তদন্তে নামতেই কেঁচো খুঁড়তে কেউটে বেরিয়ে আসে। সামনে আসে এক ভয়ঙ্কর খুনের চক্রান্ত।
এই ঘটনায় নিহতরা হলেন- রাম সিং চৌধুরী (তিনি একজন প্রাক্তন পঞ্চায়েত প্রধান), তাঁর মা পুসি দেবী, তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যজ্ঞান দেবী এবং তাঁর ভাইঝি মহিমা চৌধুরী। জ্বলন্ত গাড়ির ভেতর থেকে তিনজনের পুরো পুড়ে যাওয়া ঝলসানো মৃতদেহ উদ্ধার করে পুলিস। আর দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যজ্ঞান দেবীর রক্তাক্ত দেহ উদ্ধার হয় গাড়ির অদূরেই একটি মাঠ থেকে। তাঁর গলা কাটা ছিল এবং চারপাশের মাটিতে রক্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল। পুলিস এই চার খুনের মামলায় রাম সিং-এর প্রথম স্ত্রী সুনীতা, তাঁদের মেয়ে সরিতা এবং এক নাবালক ছেলেকে ইতোমধ্যেই আটক করেছে।
কেন এই নৃশংস হত্যালীলা?
পুলিসের তদন্তে জানা গিয়েছে, রাম সিং তাঁর দুই স্ত্রীকে নিয়ে একই বাড়িতে একসঙ্গে থাকতেন। আর এই নিয়েই পরিবারের মধ্যে প্রতিনিয়ত মারাত্মক অশান্তি ও ঝগড়াঝাটি লেগে থাকত। ২০০৫ সালে সুনীতার সঙ্গে রাম সিং-এর বিয়ে হয়েছিল। তাঁদের দুটি সন্তানও রয়েছে (এক মেয়ে ও এক ছেলে)। এরপর ২০১৯ সালে প্রথম স্ত্রী সুনীতার অমতে ও তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে রাম সিং সূর্যজ্ঞান দেবীকে দ্বিতীয় বিয়ে করেন। সূর্যজ্ঞান দেবী একজন বর্তমান জেলা পরিষদ সদস্য ছিলেন এবং পাশাপাশি আইন (Law) নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন।
আজমেরে পুলিস সুপার (SP) হর্ষ বর্ধন আগরওয়ালা জানিয়েছেন, প্রথম দিকে ঘটনাটিকে স্রেফ একটি অগ্নিকাণ্ড মনে হলেও প্রাথমিক তদন্তেই পুলিসের খটকা লাগে। ঘটনার পর পুলিস যখন প্রথম রাম সিংয়ের বাড়িতে পৌঁছায়, তখন প্রথম স্ত্রী সুনীতা পুলিসকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি দাবি করেন যে, রাম সিং তাঁর অসুস্থ মাকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছেন। কিন্তু বাড়ির ভেতর তল্লাশি চালাতেই পুলিসের সন্দেহ সত্যি প্রমাণিত হয়।
প্রথম স্ত্রীর উপর অকথ্য অত্যাচার
পুলিস যখন সুনীতার নাবালক ছেলেকে কড়া জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে। তখন সে ভেঙে পড়ে এবং নিজের অপরাধ স্বীকার করে পুরো ঘটনার কথা পুলিসকে জানায়। ছেলেটি পুলিসকে জানায়, তার বাবা রাম সিং প্রায়দিনই চরম মদ্যপান করে বাড়ি ফিরতেন। আর মদ খেয়ে এসে সে, তার মা এবং বোনের ওপর অকথ্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার চালাতেন। তার মা সুনীতাকে দিয়ে বাড়ির সমস্ত খাটুনির কাজ করানো হত, কিন্তু তাঁকে কোনওদিন বাড়ির বাইরে পা রাখতে দেওয়া হত না। দিনের পর দিন চার দেওয়ালের মধ্যে এই চরম হেনস্থা ও অত্যাচার সহ্য করতে হত তাঁদের।
ঠান্ডা মাথায় খুনের প্ল্যান
ছেলেটির দাবি, এই লাগাতার মারধর ও অত্যাচারের কারণেই নিজের বাবার প্রতি তার মনে তীব্র ক্ষোভ, রাগ ও ঘৃণার জন্ম নেয়। সে প্রায়ই তার মাকে বলত যে, সে একদিন এই বাবাকে মেরেই ফেলবে। পুলিস জানতে পেরেছে, ছেলেটি হঠাৎ করে রেগে গিয়ে এই খুন করেনি। বরং সে অনেক আগে থেকেই বাবাকে খুন করার ছক কষেছিল। এই খুনের উদ্দেশ্যেই সে অনলাইনে একটি ধারাল ছুরি অর্ডার দিয়ে আনিয়ে রেখেছিল।
নৃশংস খুনের সেই রাতে ঠিক কী হয়েছিল?
গত ২৭ মে বাড়িতে রাম সিং-এর সঙ্গে তাঁর প্রথম স্ত্রী সুনীতার ফের এক দফায় তুমুল ঝগড়া বাঁধে। সেই সময় রেগে গিয়ে ছেলেটি তার বাবাকে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এরপর সেই রাতে রাম সিং যখন গভীর ঘুমে মগ্ন ছিলেন, তখন ছেলেটি সুযোগ বুঝে তাঁর ওপর হামলা চালায় এবং ধারালো ছুরি দিয়ে তাঁর গলা কেটে দেয়। ঠিক সেই সময় পাশেই ঘুমে থাকা দ্বিতীয় স্ত্রী সূর্যজ্ঞান দেবী হঠাৎ জেগে যান এবং ছেলেটিকে এই কাণ্ড করতে দেখে ফেলেন। নিজেকে বাঁচানোর জন্য এবং অপরাধের কথা যাতে কেউ জানতে না পারে, তাই ছেলেটি সূর্যজ্ঞান দেবীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং তাঁকেও গলা কেটে খুন করে। এই ধস্তাধস্তির আওয়াজ ও চিৎকার শুনে পাশের ঘরে ঘুমে থাকা রাম সিং-এর বৃদ্ধা মা পুসি দেবী এবং ভাইঝি মহিমা সেখানে ছুটে আসেন। পুলিস জানিয়েছে, ঘটনার কোনও প্রত্যক্ষদর্শী বা সাক্ষী যাতে বেঁচে না থাকে, তাই ওই নাবালক ছেলেটি তার মা ও বোনের সাহায্য নিয়ে ধারাল এবং ভারী অস্ত্র দিয়ে ওই দুই জনকেও এলোপাথাড়ি কোপাতে শুরু করে এবং ঘটনাস্থলেই তাঁদের খুন করে।
প্রমাণ লোপাটের মরিয়া চেষ্টা
চারজনকে খুন করার পর, অপরাধের সব প্রমাণ নষ্ট করার জন্য তারা এক ভয়ংকর পরিকল্পনা করে। বাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা একটি ট্র্যাক্টরের ট্যাঙ্ক থেকে তারা ডিজেল বের করে আনে। এরপর চারজনের মৃতদেহ টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে বাড়ির বাইরে থাকা স্করপিও গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে দেয়। বাড়ি থেকে মাত্র ৫০০ মিটার দূরে হাইওয়ের ওপর গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে গিয়ে তারা সেটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। ফরেনসিক দল পরে তদন্তে দেখতে পায় যে, গাড়ির পিছনের সিটগুলো আগে থেকেই ভাঁজ করে রাখা হয়েছিল। এর থেকে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, গাড়িতে আগুন লাগার আগেই ওই চারজনকে মেরে সেখানে ঢোকানো হয়েছিল।
এদিকে তদন্তের সময় পুলিস রাম সিংয়ের বাড়ির দেওয়াল এবং মেঝের বিভিন্ন জায়গায় হালকা রক্তের দাগ দেখতে পায়। এছাড়া বাড়ি থেকে দুটি রক্তমাখা ইট এবং রক্তের দাগ লাগা একটি দেশলাই বাক্স উদ্ধার করা হয়। বাড়ির লোক যে জল এবং কেমিক্যাল ব্যবহার করে ঘরের মেঝে ও দেওয়ালের রক্ত ধুয়ে প্রমাণ মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিল, তাও পুলিসের বৈজ্ঞানিক তদন্তে ধরা পড়ে যায়। মোবাইল টাওয়ারের লোকেশন (Data) এবং ফরেনসিক ল্যাবের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে পুলি, নিশ্চিত হয়ে প্রথম স্ত্রী সুনীতা, তাঁর মেয়ে এবং নাবালক ছেলেকে আটক করে।
আগেও খুনের চেষ্টা
জিজ্ঞাসাবাদে ওই নাবালক ছেলেটি পুলিসকে আরও জানিয়েছে যে, সে এবারই প্রথম নয়, এর আগেও বহুবার তার বাবাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করেছিল। কখনও সে বাবার খাবারে বিষ মিশিয়ে দিয়েছিল, তো কখনও খনি অঞ্চলে ঘুরতে নিয়ে গিয়ে পাহাড়ের ওপর থেকে ধাক্কা মেরে নীচে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু প্রতিবারই কোনও না কোনওভাবে রাম সিং বেঁচে যান। অবশেষে অনলাইনে কেনা ছুরি দিয়েই সে এই চারজনকে খুন করে। পুলিস বর্তমানে ওই নাবালক ছেলেকে নিজেদের হেফাজতে নিয়েছে। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে প্রথম স্ত্রী ও মেয়ের ভূমিকা ঠিক কতটা ছিল এবং এই ঘটনার সঙ্গে অন্য কোনও বাইরের লোক বা সহযোগী যুক্ত আছে কি না, তা জানার জন্য মা ও বোনকে লাগাতার জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

