জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও এক চরম যুদ্ধের দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির অন্তর্বর্তীকালীন সমঝোতা এখন কার্যত "শেষ"। হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে শুরু হওয়া নজিরবিহীন বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পরই ট্রাম্পের এই বিস্ফোরক মন্তব্য সামনে এল।
"ওরা হিংস্র ও অসুস্থ মানুষ": আঙ্কারায় ট্রাম্প
তুরস্কের আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে আর কোনো চুক্তি বা লেনদেনে যাওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেন। যুদ্ধবিরতির বর্তমান অবস্থা নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন: "আমার মনে হয়, এটা শেষ। আমি ওদের সঙ্গে আর কোনো লেনদেন করতে চাই না। ওদের সঙ্গে ডিল করা স্রেফ সময় নষ্ট। ওরা জঘন্য, হিংস্র এবং অসুস্থ মানুষ। ওদের হাতে যদি পারমাণবিক অস্ত্র থাকত, ওরা সেটা ব্যবহার করত।" ট্রাম্প অবশ্য জানিয়েছেন যে মার্কিন প্রতিনিধিরা চাইলে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারেন, তবে তার ফলাফল নিয়ে তিনি চরম সন্দিহান। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যেই ইরানি তেল বিক্রির বিশেষ লাইসেন্স বা অনুমতিও বাতিল করে দিয়েছে।
ইরানের ওপর আমেরিকার স্মরণকালের তীব্র হামলা
মঙ্গলবারের মার্কিন বিমান হামলাটি ছিল গত এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর ইরানের ওপর চালানো সবচেয়ে বড় সামরিক পদক্ষেপ। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজে হামলার "শাস্তি" হিসেবে ইরানের বন্দর আব্বাস, সিরিক বন্দর শহর এবং কেশম দ্বীপে এই ভয়াবহ হামলা চালানো হয়, যা আগের যেকোনো হামলার চেয়ে চার-পাঁচ গুণ বেশি শক্তিশালী ছিল। আমেরিকার এই হামলা এমন এক সময়ে হলো, যখন ইরানের রাজধানী তেহরানে যুদ্ধের শুরুর দিকে নিহত সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির বহুদিনের দীর্ঘায়িত শেষকৃত্য চলছিল। হামলার ফলে ইরানের বুশেহর পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র কমপ্লেক্সের ঘাঁটি এবং বন্দর মাহশাহরে তীব্র বিস্ফোরণ ঘটে, যেখানে একজন রেভল্যুশনারি গার্ড সদস্য নিহত হয়েছেন।
কুয়েত ও বাহরাইনে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মার্কিন হামলার জবাবে ইরানও হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড সরাসরি বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহরের ঘাঁটি এবং কুয়েতের মার্কিন সেনা ঘাঁটিতে একযোগে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। হামলার পর দুই দেশেই মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে যুদ্ধের সাইরেন বেজে ওঠে। সংযুক্ত আরব আমিরাতের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক আনোয়ার গারগাশ ইরানের এই পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে "উত্তেজনা কমাতে তেহরানের অক্ষমতার প্রমাণ" বলে উল্লেখ করেছেন।
"আমরা মাথা নত করব না": ইরানের পাল্টা হুঁশিয়ারি
মার্কিন হামলার পর খাতাম-আল-আনবিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর ও ইরানের সামরিক বাহিনী এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা এই "স্পষ্ট আগ্রাসনের" বিরুদ্ধে "চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেওয়ার মতো জবাব" দিতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে, এক্স-এ পোস্ট করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রধান প্রতিনিধি মোহাম্মদ বাগের ঘালিবাফ বলেন: "যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। তারা তেল নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করেছে এবং দক্ষিণ ইরানে হামলা চালিয়েছে। কিন্তু জুলুম আর ব্ল্যাকমেইলের যুগ শেষ। আমরা কোনোভাবেই মাথা নত করব না।"
অনিশ্চয়তায় শান্তি আলোচনা
খামেইনির শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়ার পর হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত করার লক্ষ্যে একটি চূড়ান্ত চুক্তির আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আমেরিকার এই বিধ্বংসী বিমান হামলা এবং কুয়েত-বাহরাইনে ইরানের পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ফলে সেই শান্তি প্রক্রিয়া এখন সম্পূর্ণ খাদের কিনারায়। যদিও কোনো পক্ষই আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনার টেবিল ছাড়েনি, তবে বর্তমান পরিস্থিতি গোটা মধ্যপ্রাচ্যকে এক মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

