জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই রাজ্যে শোরগোল ফেলে দেওয়া ঘটনা, মুখ্যমন্ত্রীর আপ্ত সহায়ক চন্দ্রনাথ রথ হত্যার ঘটনা। এই মামলায় এবার বড় সাফল্য পেল কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই।
বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের ঠিক পরই গত ৬ মে মধ্যমগ্রামের কাছে দুষ্কৃতীদের গুলিতে নিহত হন চন্দ্রনাথ রথ।
চাঞ্চল্যকর এই হাইপ্রোফাইল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নেমে শুক্রবার (৩১ জুলাই) আরও দুই মূল ষড়যন্ত্রকারীকে গ্রেফতার করেছে সিবিআই। ধৃতদের বিরুদ্ধে ভাড়াটে শুটার দিয়ে 'সুপারি কিলিং' বা চুক্তিভিত্তিক খুনের পরিকল্পনা ও নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ধৃত দুই মূল ষড়যন্ত্রকারী
সিবিআই সূত্রের খবর অনুযায়ী, গ্রেফতার হওয়া দুই অভিযুক্তের নাম সাগর সোনকর এবং সাহেব সোনকর। এই দুই ভাই দীর্ঘদিন ধরে চন্দ্রনাথ রথের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহকারী হিসেবে কাজ করতেন।
সিবিআই তদন্তে জানতে পেরেছে যে, তারা কেবল চন্দ্রনাথের গতিবিধির ওপর নজর রাখা বা তথ্য সরবরাহ করাই নয়, বরং তাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সরাসরি ভাড়াটে খুনিদের সুপারি দিয়ে চুক্তি করেছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, ধৃত সাগর সোনকরের সঙ্গে একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ল্যান্ডলাইন নম্বরে নিয়মিত যোগাযোগের সুস্পষ্ট প্রমাণ ও কল রেকর্ড উদ্ধার করা হয়েছে। ধৃতদের বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কলকাতায় একটি বিশেষ আদালতে পেশ করার প্রস্তুতি চলছে।
আন্তঃরাজ্য ষড়যন্ত্র ও ভাড়াটে শুটার চক্র
গত মে মাসে ঘটে যাওয়া এই হত্যাকাণ্ডে শুরু থেকেই পেশাদার ভাড়াটে খুনিদের ব্যবহারের ইঙ্গিত পেয়েছিল পুলিস ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা। উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামের কাছে বাইকে করে আসা আততায়ীরা পয়েন্ট-ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে তিন রাউন্ড গুলি চালিয়ে চন্দ্রনাথ রথকে হত্যা করে।
এরপর ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে মামলাটির দায়িত্ব নেয় সিবিআই। ৭ সদস্যের একটি বিশেষ তদন্তকারী দল (এসআইটি) গঠন করে পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ এবং বিহারের বিভিন্ন এলাকায় তল্লাশি অভিযান চালানো হয়।
এর আগে মে ও জুন মাসে এই ঘটনায় বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজন ভাড়াটে শুটারকে গ্রেফতার করে সিবিআই। যার মধ্যে উত্তর প্রদেশের বলিয়া থেকে রাজকুমার সিং, মায়াঙ্ক রাজ মিশ্র, ভিকি মৌর্য এবং জ্ঞানেন্দ্র প্রতাপ সিং ওরফে 'মনু'-কে হেফাজতে নেওয়া হয়।
এছাড়া নবীন কুমার সিং ও গোলু সিং ওরফে 'টাইগার' নামের দুই অভিযুক্তকেও সিবিআই গ্রেফতার করে। তদন্তকারী দল এই ঘটনায় ব্যবহৃত গাড়ি ও দুটি মোটরবাইকও বাজেয়াপ্ত করেছে।
শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠদের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ইতিহাস
চন্দ্রনাথ রথের এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, গত ১৩ বছরে শুভেন্দু অধিকারীর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ চারজন সহযোগীর রহস্যজনক বা অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে মৃত্যু ঘটেছে:
১. প্রদীপ ঝা (২০১৩): শুভেন্দু অধিকারীর তৎকালীন ব্যক্তিগত সহকারী প্রদীপ ঝার দেহ কলকাতার স্ট্র্যান্ড রোডে রহস্যজনক অবস্থায় উদ্ধার হয়।
২. শুভব্রত চক্রবর্তী (২০১৮): শুভেন্দু অধিকারীর বহু বছরের দেহরক্ষী শুভব্রত চক্রবর্তী নিরাপত্তা ক্যাম্পে নিজের সার্ভিস রিভলভারের গুলিতে প্রাণ হারান।
৩. পুলক লাহিড়ী (২০২১): একুশের নির্বাচন চলাকালীন চরম রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে মারা যান তাঁর এই ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী।
৪. চন্দ্রনাথ রথ (২০২৬): সর্বশেষ গত মে মাসে নির্বাচনের ফলের পরপরই প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন চন্দ্রনাথ।
তদন্তের বর্তমান পরিস্থিতি
সিবিআই সূত্রের দাবি, নতুন করে সাগর ও সাহেব সোনকরের গ্রেফতারের পর এই সুপারি কিলিংয়ের পিছনে থাকা বৃহত্তর রাজনৈতিক চক্রান্ত উন্মোচনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছেন তদন্তকারীরা।
ভাড়াটে শুটারদের কাছে কোথা থেকে টাকা পৌঁছেছিল, হাওয়ালা কোনও মাধ্যম কাজ করেছে কি না এবং কারা আড়ালে থেকে নির্দেশ দিয়েছিল--তা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। আগামী দিনে ধৃতদের মুখোমুখি বসিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে চন্দ্রনাথ রথ খুনের সম্পূর্ণ পর্দা উন্মোচিত হবে বলে আশা করছেন তদন্তকারীরা।

