জি ২৪ ঘণ্টা ডিজিটাল ব্যুরো: 'চিকেন নেক' করিডর। ভারতের সুরক্ষার ক্ষেত্রে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই 'চিকেন নেক' করিডর। এই 'চিকেন নেক' করিডরের কাছেই এবার শতাধিক একর জমি কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে রাজ্য সরকার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন বাংলার প্রথম বিজেপি সরকার সম্প্রতি ৭টি জাতীয় সড়ক সম্প্রসারণের জন্য কেন্দ্রীয় সংস্থাগুলির হাতে তুলে দেওয়ার অনুমোদন দেওয়ার পরই সামনে এসেছে সরকারের এই পদক্ষেপের কথা।
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই প্রায় ৬০০ একর জমি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি, জাতীয় সড়কের সাতটি অংশ ন্যাশনাল হাইওয়েজ অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (NHAI) এবং ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড (NHIDCL)-এর হাতে তুলে দেওয়ার অনুমোদনও দেওয়া হয়। যার ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পরিকাঠামো সংক্রান্ত প্রকল্পগুলির কাজ এগোতে পারবে। তবে বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের সঙ্গে জাতীয় সড়কের অংশবিশেষ তুলে দেওয়ার কোনও যোগসূত্র নেই।
এখন যে অঞ্চলগুলি বিএসএফ-কে হস্তান্তরের জন্য চিহ্নিত হয়েছে বলে খবর, সেগুলি ভারতের নিরাপত্তার দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেগুলি 'চিকেন নেক' করিডরের খুব কাছাকাছি। এখন এই 'চিকেন নেক' করিডর বাংলাদেশ ও নেপালের সীমান্তঘেঁষা। পাশাপাশি পূর্বদিকে ভূটান সীমান্ত রয়েছে। চিনের চুম্বি ভ্যালিও খুব দূরে নয়।
কেন জমি হস্তান্তর করছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার?
ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্যই বিএসএফকে জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে অবৈধ অনুপ্রবেশ আটকানো ও সেই সংক্রান্ত সমস্যা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে বলে আশাবাদী সরকার। শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "৪৫ দিনের মধ্যে জমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর বিএসএফ সীমান্তে বেড়ার কাজ সম্পূর্ণ করবে। তাতে অবৈধ অনুপ্রবেশের সমস্যা দ্রুত মিটবে।"
সূত্রের খবর, এই জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে। ১০০ একরেরও বেশি জমি ইতিমধ্যে কেন্দ্রের হাতে তুলেও দেওয়া হয়েছে। যদিও এই বিষয়ে এখনও সরকারি তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। ঠিক কোন কোন জমি হস্তান্তর করা হচ্ছে। তবে এই জমি হস্তান্তরের পদক্ষেপ যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে, তা বলাই বাহুল্য।
ভারতের সুরক্ষায় 'চিকেন নেক' করিডরের কূটনৈতিক তাৎপর্য
প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূ-রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে শিলিগুড়ি করিডোর বা 'চিকেন নেক' ভারতের জাতীয় সুরক্ষার ক্ষেত্রে ভীষণই সংবেদনশীল এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল। মাত্র ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া এই সংকীর্ণ ভূখণ্ডটি ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সেভেন সিস্টার্স এবং সিকিম- মোট ৮টি রাজ্যকে জুড়ে রাখে।
সামরিক গুরুত্ব: সামরিক রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে 'চিকেন নেক' ভারতের জন্য একটি প্রধান লাইফলাইন। যুদ্ধকালীন বা যে কোনও জরুরি পরিস্থিতিতে উত্তর-পূর্ব সীমান্তে সেনা মোতায়েন ও সামরিক রসদ সরবরাহের জন্য একমাত্র স্থলপথ। এটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়লে মূল ভূখণ্ড থেকে উত্তর-পূর্ব ভারত সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
চিনের আগ্রাসন মোকাবিলায়: 'চিকেন নেক' করিডোরের ঠিক উত্তরেই রয়েছে তিব্বতের চুম্বি উপত্যকা। চিন সবসময়ই চেষ্টা করে এই 'চিকেন নেক'-এ আঘাত হেনে ভারতকে চাপে রাখতে। যার অন্যতম উদাহরণ ২০১৭ সালের ডোকলাম সংকট। চিনের এই 'কাট-অফ' নীতিকে মোকাবিলা করতেই ভারত এখানে ত্রি-শক্তি কর্পস ও উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা মোতায়েন করেছে। ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বেজিংয়ের আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টাকে প্রতিহত করতে 'চিকেন নেক' করিডোরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের কূটনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
আঞ্চলিক কূটনীতি: 'চিকেন নেক' করিডোর নেপাল, ভুটান এবং বাংলাদেশ- এই তিন প্রতিবেশী রাষ্ট্র পরিবেষ্টিত। এখন ভারতের পররাষ্ট্রনীতি বা 'অ্যাক্ট ইস্ট পলিসি' সফল করতে গেলে এই অঞ্চলের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। যেকারণে ভূটান ও নেপালের সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করা ও সেইসঙ্গে বাংলাদেশের সাথে ট্রানজিট চুক্তির মাধ্যমে বিকল্প পথ তৈরি করা ভারতের কূটনৈতিক অ্যাজেন্ডার মধ্যে অগ্রাধিকারে রয়েছে। আর এই আঞ্চলিক কূটনীতিতে 'চিকেন নেক' করিডরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভালো যে, সাতটি জাতীয় সড়কের অংশবিশেষ NHAI এবং NHIDCL-এর হাতে তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্তের সঙ্গে বিএসএফকে জমি হস্তান্তরের প্রসঙ্গ সম্পর্কিত নয়। এই সড়কগুলি এতদিন রাজ্যের পূর্ত দফতরের জাতীয় সড়ক শাখার অধীনে ছিল। সরকারের দাবি, কেন্দ্রীয় সড়ক পরিবহণন ও মহাসড়ক মন্ত্রকের একাধিকবার অনুরোধ সত্ত্বেও প্রায় এক বছর ধরে এই হস্তান্তরের প্রস্তাব ঝুলে ছিল। এই সাতটি সড়ক পশ্চিমবঙ্গকে সিকিম, ভূটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ফলে কেন্দ্রীয় সংস্থার হাতে তুলে দেওয়ার ফলে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থা কাটবে এবং উন্নয়ন সম্ভব হবে।

