নিজের নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুরে ঐতিহাসিক জয়ের পর প্রথমবার পা রেখেই বিদায়ী শাসকদলের বিরুদ্ধে ঝাঁঝালো আক্রমণ শানালেন রাজ্যের নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সোমবার সন্ধ্যায় ভবানীপুরের ক্যামাক স্ট্রিটের এক সভা থেকে তিনি স্পষ্ট করে দেন, রাজ্যে নতুন বিজেপি সরকারের আমলে এক এক করে দুর্নীতির পুরোনো সমস্ত ফাইল খোলা হচ্ছে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলেই দুর্নীতিগ্রস্তদের শ্রীঘরে যেতে হবে।
এই মঞ্চ থেকেই নাম না করে তীব্র কটাক্ষ করার পাশাপাশি তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়সহ ৪ প্রভাবশালী নেতার নাম ও তাঁদের বিপুল সম্পত্তির খতিয়ান প্রকাশ করে সরাসরি হাজতবাসের হুঁশিয়ারি দেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্ক্যানারে ভাইপো ও কাউন্সিলারেরা, ৪ জনের সম্পত্তির খতিয়ান দিলেন মুখ্যমন্ত্রী
মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানান, কলকাতা পুরসভার (KMC) একাধিক দুর্নীতির ফাইল এবার নতুন করে খোলা হচ্ছে। কীভাবে বিগত জমানায় রাজ্য ও কলকাতার তহবিল লুট করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যেই মন্ত্রিসভার বৈঠকে একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষ 'ক্যাবিনেট কমিটি' গঠন করা হয়েছে। এরপরই একে একে ৪ জনের নাম ও সম্পত্তির হিসাব তুলে ধরেন তিনি:
- অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়: মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, 'ভাইপো' অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নামে এবং বেনামে বিপুল প্রপার্টি রয়েছে। লিপস অ্যান্ড বাউন্ডস কোম্পানির নামে ১৪টি, নিজের নামে ৪টি এবং বাবার নামে আরও ৬টি মিলিয়ে মোট ২৪টি প্রপার্টির হদিস মিলেছে।
- ফয়েজ খান: রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী জাভেদ খানের ছেলে ফয়েজের নামে একাই ৯০টি প্রপার্টি বা সম্পত্তি রয়েছে বলে দাবি শুভেন্দুর।
- সোনা পাপ্পু ও রাজু নস্কর: কসবার বিতর্কিত সোনা পাপ্পুর ২৪টি প্রপার্টি এবং বেলেঘাটার রাজু নস্করের ১৮টি প্রপার্টির ফাইল খোলা হয়েছে।
তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের হুঁশিয়ারি দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, "যেভাবে শান্তনু সিনহা বিশ্বাস এবং সুজিত বসু ইতিমধ্যেই দুর্নীতির দায়ে ভেতরে ঢুকে গিয়েছেন, আগামী দিনে আইন মেনে বাকি এই লুটেরাদেরও হাজতবাস করাবে ভারতীয় জনতা পার্টি সরকার। আমরা কাউকে ছেড়ে কথা বলার লোক নই।"
৭৭ নম্বর ওয়ার্ড বাদে সব জায়গায় খুলবে অফিস, সংখ্যালঘু বুথ নিয়ে তোপ
ভবানীপুরের ভোটারদের ধন্যবাদ জানিয়ে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, "গত ১৫ বছর আপনারা বুঝতে পারেননি বিধায়ক কেমন হওয়া উচিত, কোনো পরিষেবা পাননি। কিন্তু এবার গ্রামের একটা ছেলেকে আপন করে নিয়ে আপনারা মমতার অহংকার ভেঙে দিয়েছেন।" তবে এর পরেই তিনি এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও বিতর্কিত ঘোষণা করেন। শুভেন্দু জানান, ভবানীপুরের ৭টি ওয়ার্ডে তিনি নিজে 'ওয়ার্ড অফিস' খুলে সাধারণ মানুষকে সমস্ত পরিষেবা দেবেন, কিন্তু একমাত্র ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডের জন্য তিনি এখনই কিছু করবেন না।
উল্লেখ্য, এই ৭৭ নম্বর ওয়ার্ডটি মূলত মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা এবং সেখান থেকেই সবচেয়ে কম ভোট পেয়েছেন শুভেন্দু। গত ৪ মে ফলপ্রকাশের দিনও তিনি দাবি করেছিলেন যে মুসলিমরা তাঁকে ভোট দেননি। এদিনও তিনি স্পষ্ট বলেন, "৭৭ নম্বর ওয়ার্ডে কোনো অফিস খুলব না, সেখানে পরিষেবা দেব কি না তা পরে ভেবে দেখব। ওখান থেকে উনি (তৃণমূল) ১৯ হাজার ভোট পেলেও, চেতলার ৮২ নম্বর ওয়ার্ডের হিন্দুরা আমায় ১৫ হাজার ভোটের লিড দিয়েছে।"
মমতা-ফিরহাদের নিজের বুথেই এগিয়ে বিজেপি, অনুপ্রবেশকারীদের হুঙ্কার
নিজের বক্তব্যের সপক্ষে পরিসংখ্যান তুলে ধরে মুখ্যমন্ত্রী জানান, খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজের স্কুল 'মিত্র ইনস্টিটিউশন' ভোটকেন্দ্রের ৪টি বুথেই বিজেপি বিপুল ভোটে এগিয়ে ছিল। এমনকি কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিমের বাসভবনের উল্টোদিকে চেতলা গার্লস স্কুলের সবকটি বুথেও পদ্ম শিবির লিড পেয়েছে। শুভেন্দুর কটাক্ষ, "যাঁরা নিজেদের বুথেই দলকে জেতাতে পারেন না, তাঁদের বাংলার মানুষ চিরতরে টাটা বাই-বাই করে দিয়েছে।" সভায় তিনি ভবানীপুরের মারওয়াড়ি, গুজরাটি, জৈন এবং শিখ সমাজের ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
একই সাথে আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, বাংলায় বিজেপি সরকার আসায় এবং তিনি নিজে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ায় ওপার বাংলার বাংলাদেশের জামাতপন্থীদের 'চিড়বিড়ানি' বা অস্বস্তি অনেক বেড়ে গিয়েছে। পার্ক সার্কাসের সাম্প্রতিক পাথর ছোঁড়ার ঘটনা এবং অনুপ্রবেশকারীদের কড়া বার্তা দিয়ে শুভেন্দু বলেন, "আমি ভয় পাওয়ার বা থেমে যাওয়ার মানুষ নই। দেশকে সুরক্ষিত রাখার কাজ বিজেপিই করবে। যে পথে অনুপ্রবেশকারীরা ভারতে এসেছিল, এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়ার পর সসম্মানে সে পথেই বাংলাদেশ ফিরে যান। আর পার্ক সার্কাসে যাঁরা আমাদের পুলিশ ভাইদের ওপর পাথর ছুঁড়েছে, তাদের এর চরম ফল ভুগতে হবে।"
The post 'এবার ভাইপো!' জেলের হুঁশিয়ারি শুভেন্দুর appeared first on বার্তা.in.

