বর্তমান যুগে প্রযুক্তির ছোঁয়ায় জীবন সহজ হলেও, এর অতিরিক্ত ব্যবহার এখন মানবদেহের জন্য বড় অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে বিছানায় শুয়ে গভীর রাত পর্যন্ত মোবাইল স্ক্রিনে বুঁদ হয়ে থাকার অভ্যাস সমাজজুড়ে মহামারি আকার ধারণ করেছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ছোট ভিডিও বা রিলস দেখার এই মারাত্মক নেশা শুধু যে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করছে তা নয়, বরং চিকিৎসকদের মতে এটি মানুষকে নিঃশব্দে ঠেলে দিচ্ছে স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের দিকে।
শিশু ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে, যা তাদের দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক পঙ্গুত্বের দিকে ধাবিত করছে।
হরমোনের ভারসাম্যহীনতা ও অনিদ্রার ফাঁদ
চিকিৎসকদের মতে, ঘুমানোর আগে দীর্ঘক্ষণ ফোনের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে স্ক্রিন থেকে নির্গত ক্ষতিকর 'ব্লু লাইট' বা নীল আলো মানবদেহে তীব্র নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই আলো মস্তিষ্কে প্রাকৃতিক ঘুম উদ্রেককারী হরমোন 'মেলাটোনিন' ক্ষরণে বাধা সৃষ্টি করে। ফলে শরীরের স্বাভাবিক স্লিপ সাইকেল বা ঘুমের চক্র সম্পূর্ণ বিগড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে এটিকে সাধারণ অনিদ্রা মনে হলেও, দীর্ঘদিন ধরে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার কারণে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায় এবং শিশুরা ঘন ঘন অসুস্থ হতে শুরু করে। এমনকি গভীর রাতে ঘুমালেও বারবার ঘুম ভেঙে যাওয়ার মতো জটিল সমস্যা তৈরি হয়।
শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা ও চোখের স্থায়ী ক্ষতি
রাতে ঘুম পূরণ না হলে পরবর্তী দিন শরীরে চরম ক্লান্তি ও অবসাদ ভর করে। এই ক্লান্তির কারণে মানুষের দৈনিক শারীরিক সক্রিয়তা এক ধাক্কায় কমে যায়, যার ফলে শরীর পর্যাপ্ত ক্যালোরি বার্ন করতে পারে না। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এই প্রক্রিয়াই মূলত ওজন বৃদ্ধি এবং ওবেসিটি বা স্থূলতার মূল কারণ। মা-বাবারা শিশুদের স্থূলতার জন্য কেবল ফাস্টফুডকে দায়ী করলেও এর অন্যতম প্রধান অনুঘটক হলো রাতের মোবাইল আসক্তি। এছাড়া একটানা ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে চোখে শুষ্কভাব, চুলকানি ও তীব্র মাথাব্যথা দেখা দেয়, যা পরবর্তীতে চশমার পাওয়ার দ্রুত বাড়িয়ে দেয়। একই সাথে দীর্ঘক্ষণ শুয়ে-বসে ফোন ব্যবহারের ফলে অল্প বয়সেই ঘাড় ও পিঠে ব্যথা এবং সারভাইকাল স্পন্ডিলাইটিসের মতো হাড়ের রোগ বাসা বাঁধছে।
স্মৃতিশক্তি হ্রাস ও মনোযোগের বিপর্যয়
মোবাইল ফোনের এই নীল আলো ও অনিদ্রার জোড়া ধাক্কা সরাসরি আঘাত করছে মানব মস্তিষ্কে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব সবচেয়ে মারাত্মক। চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলছেন, রাতের এই কুঅভ্যাসের কারণে নতুন প্রজন্মের স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে এবং যেকোনো জরুরি কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাবে পড়াশোনায় মনোযোগ নষ্ট হচ্ছে এবং তা থেকে তৈরি হচ্ছে তীব্র মানসিক চাপ ও খিটখিটে মেজাজ। সামগ্রিক এই শারীরিক ও মানসিক বিপর্যয় এড়াতে বিছানায় যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন দূরে রাখার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
The post রাতের স্মার্টফোন কেড়ে নিচ্ছে ঘুম, নিঃশব্দে ডেকে আনছে স্থূলতা ও অন্ধত্ব appeared first on বার্তা.in.

