Dailyhunt Logo
  • Light mode
    Follow system
    Dark mode
    • Play Story
    • App Story
মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৪

মেঘে মেঘে বেলা : পর্ব ৪

Daak Bangla 1 month ago

যৌবনসরসীনীরে

ত্যি কথা বলতে কী, আমি আমার যৌবনের আমিটাকে সবদিক থেকেই মিস করি। আমার শরীরটাকে মিস করি বড্ড বেশি। যৌবনে কেউ-ই কল্পনা করে না, এ-জিনিস টেম্পোরারি। এই শারীরিক সক্ষমতা, এই তেজ ধীরে-ধীরে কমবে, এ-কথা জীবনবিজ্ঞানের দিক থেকে সত্যি হতে পারে, আমার জীবনের ক্ষেত্রে কক্ষনও সত্যি হবে না যাঃ!

পরপর চার রাত জেগেও হই-হুল্লোড়ে খামতি নেই, বন্ধুদের সঙ্গে গোটা কলকাতা চষে বেড়ানো, আত্মীয়-পরিজনদের জন্য হাসপাতাল-বাড়ি, ব্লাড, অ্যাম্বুলেন্স-সব কিছুই যেন আপনাআপনি হয়ে যেত। অক্লান্ত কাজ করা বা অক্লান্ত আড্ডা মারা-দুটোতেই পারদর্শী ছিলাম। হেসে-হেসে গাল ব্যথা হয়ে যেত বলেই হয়তো কোনওকিছুর পরোয়া করতাম না। আসলে যৌবনের শরীরের সবচেয়ে বড় বিলাসিতা ছিল- শরীর নিয়ে না ভাবা। পেটে চর্বি জমল কি না, চোখের নীচে কালি পড়ল কি না, চুল একটু উঠে গেল কি না- এসব নিয়ে তখন ভাবার প্রশ্নই উঠত না। শরীরটা ছিল নিঃশব্দে নিজের কাজ করে যাওয়া এক বিশ্বস্ত সহকারী। রাত জেগে প্রেম, ফুচকা, কান্না, বাস মিস, হঠাৎ বৃষ্টি- সব সামলে নিত অনায়াসে। আয়না তখন আমার খুঁত জানান দিত না, কেবল টিপটা দুটো ভুরুর মাঝখানে ঠিক পরেছি কি না, সেটুকুই ক্যালকুলেট করার অনুমতি আয়নাকে দিয়েছিলাম। মাঝবয়সে এসে বুঝি, যৌবনের আসল সৌন্দর্য ছিল সরু কোমরে নয়- নিজের শরীরকে ভুলে থাকার সেই বেপরোয়া স্বাধীনতায়।

একসময় সিঁড়ি ভাঙা ছিল জীবনেরই একটা অংশ- দু'ধাপ একসঙ্গে লাফিয়ে ওঠা, দেরি হয়ে গেলে হুড়মুড় করে চারতলা উঠে যাওয়া, তারপরও হাঁপ না ধরা। এখন সিঁড়ির সামনে দাঁড়ালেই হাঁটু আগে সতর্ক করে: আগে ভাবো, তারপর ওঠো। একসময় চুল ছিল কোমর ছাপিয়ে আরও মাইলখানেক লম্বা, আর তেমনি তার বাহার। এত ভারী চুল, এত ঘন চুল না সামলাতে পারার জন্য অভিযোগ চলত হরবখত। কিংবা হঠাৎ ছোট করে কেটে ফেলা, বারগান্ডি রং, স্টেপ কাট, স্ট্রেটনিং- যেন মাথার ওপর একটা ব্যক্তিগত বিদ্রোহ চলত। এখন সকালে বালিশে কয়েকটা চুল দেখলেই মন খারাপ হয়ে যায়। শ্যাম্পুর বোতলে 'অ্যান্টি-হেয়ারফল' লেখা না থাকলে আর ভরসা হয় না। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সিঁথিটা একটু চওড়া লাগলেই মনে হয়, বয়সটা বুঝি আজ আরও স্পষ্ট হয়ে গেল।

ভুলে যাওয়া আসলে মাঝবয়সের টিকে থাকার কৌশল!
পড়ুন 'মেঘে মেঘে বেলা' পর্ব ৩…

বয়স বাড়লে শুধু ত্বক আলগা হয় না, নিজের ওপর নির্ভরতাটাও কোথাও একটু ক্ষয়ে যায়। কারণ সমাজ মেয়েদের শেখায়, আত্মবিশ্বাসেরও একটা 'এক্সপায়ারি ডেট' আছে- আর সেটা যৌবনের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা। তাই আয়নায় নতুন বলিরেখা দেখলে শুধু বয়সের ভয় আসে না, আসে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভয়ও। অথচ সত্যিটা হল, এই বয়সে একজন মেয়ে সবচেয়ে পরিণত, আশ্চর্য। সবচেয়ে বেশি জানে, বোঝে, সবচেয়ে বেশি সহ্য করেছে, টিকে থেকেছে। শুধু সমাজ এখনও সেই অভিজ্ঞতার সৌন্দর্য দেখতে শেখেনি।

মনের সৌন্দর্যের কথা যদি বাদও দিই, মাঝবয়সের শরীরেরও একধরনের গভীর সৌন্দর্য আছে। এই সৌন্দর্য ইনস্টাগ্রামের ফিল্টারে ধরা পড়ে না, বিউটি পার্লারের আলোতেও নয়। এখানে পেটের স্ট্রেচমার্কে ঘুমহীন রাতের ইতিহাস আছে, সিজারিয়ান কাটা দাগে এক নতুন প্রাণকে পৃথিবীতে আনার সাহস আছে। চোখের নীচের ক্লান্তি শুধু বয়সের নয়, বহুদিন ধরে সবাইকে আগলে রাখারও। এই শরীর প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, সংসারে অবহেলিত হয়েছে, তবু পরদিন সকালে উঠে রান্না করেছে, অফিস গেছে, সন্তানকে স্কুলে পাঠিয়েছে। যৌবনের শরীর হয়তো নিখুঁত ছিল, কিন্তু মাঝবয়সের শরীর হল গুপ্তধনের মানচিত্র। তাকে শুধু লোভী চোখ নয়, জাগ্রত মন নিয়ে; শুধু আকর্ষণ নয়, সমঝদারি আর সম্মান নিয়ে দেখতে জানতে হবে। তখন বোঝা যাবে, সে-শরীরে লড়াই আছে, হার না মানার ইতিহাস আছে, আর আছে এক ধরনের নীরব মর্যাদা, যা বয়স ছাড়া পাওয়া যায় না।

তাই আমার যৌবনের শরীরটাকে মিস করলেও, এই শরীরটার সঙ্গেও ইদানীং একটু-আধটু বন্ধুত্ব করে নিতে শিখছি। জানি হাঁটু-কোমর ব্যথা হবে, কপাল ঢাকতে চুলের স্টাইল বদলাতে হবে। এমনকী, সুস্থ থাকার জন্য জোর করে খানিক রোগাও হতে হবে। কিন্তু এও তো ঠিক, এই শরীরটা নিজের ইচ্ছে মতো জামা-কাপড় পরতে পারবে, অন্যে কী ভাবল, সেই দায়টা নেবে না, আমায় ভাল দেখাল কী না- তারও তোয়াক্কা অতটা করবে না! এবং অন্যে না শুনুক, নিজে গুনগুন করবে, 'এখনও তো কেউ জানে না আমার স্ট্যাটিসটিক্স…আমি মিস ক্যালকাটা…'

Dailyhunt
Disclaimer: This content has not been generated, created or edited by Dailyhunt. Publisher: Daak Bangla