By Suman Munshi
Kolkata,15 September:
বাস্তবে একটি বাড়ির বা বারোয়ারি দুর্গাপূজার আয়োজক ও পুরোহিত-দু'পক্ষের ব্যবহারযোগ্য "মহাষষ্ঠী পূর্ণাঙ্গ চেকলিস্ট" হিসেবে সাজালাম। আমি বিশেষভাবে কল্পারম্ভ → বোধন → অধিবাস → আমন্ত্রণ এই মূল কাঠামোকে কেন্দ্র করেছি, কারণ বেলুড় মঠের প্রকাশিত দুর্গাপূজা-পদ্ধতিতেও ষষ্ঠীর প্রধান প্রস্তুতিমূলক আচার হিসেবে এগুলিই উল্লেখ আছে।
(Belur Math)
২০২৬ সালে মহাষষ্ঠী ১৬ অক্টোবর, শুক্রবার। তবে বোধন, কল্পারম্ভ, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের ঘড়ির সময় আপনার অনুসৃত পশ্চিমবঙ্গের পঞ্জিকা ও পুরোহিতের পদ্ধতি অনুযায়ী চূড়ান্ত করতে হবে-বিভিন্ন পঞ্জিকায় সময়ের পার্থক্য থাকতে পারে।
সকাল - কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা
↓
সন্ধ্যা - বোধন
↓
অধিবাস
↓
আমন্ত্রণ
↓
দেবীর পূজা ও আরতি
↓
পরদিন সপ্তমীর নবপত্রিকা ও মূল পূজার প্রস্তুতি
বেলুড় মঠের প্রকাশিত পদ্ধতিতে ষষ্ঠীর সকালেই কল্পারম্ভ এবং সন্ধ্যায় বোধন, অধিবাস ও আমন্ত্রণের ধারাটি স্পষ্টভাবে দেওয়া হয়েছে। (Belur Math)
আগের দিনই সম্পূর্ণ করে রাখুন:
পূজাস্থান পরিষ্কার, গোছানো ও অপ্রয়োজনীয় জিনিসমুক্ত রাখুন।
আগে থেকে প্রস্তুত রাখুন:
বেলুড় মঠের পদ্ধতিতে কল্পারম্ভের সময় দুর্গামণ্ডপের এক কোণে জলপূর্ণ তাম্রঘট স্থাপন করে দুর্গা ও চণ্ডীর পূজা করার কথা বলা হয়েছে। (Belur Math)
এটি ষষ্ঠীর দিনের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আচার।
কল্পারম্ভের মূল ভাব হলো পুরো দুর্গাপূজা সঠিকভাবে সম্পন্ন করার সংকল্প গ্রহণ। বেলুড় মঠও এটিকে "samkalpa" বা দৃঢ় পূজা-সংকল্প হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। (Belur Math)
❌ কল্পারম্ভকে শুধু "ঘটে জল দেওয়া" মনে করবেন না।
❌ সংকল্প বাদ দিয়ে পূজা শুরু করবেন না।
❌ অন্য বছরের YouTube ভিডিও দেখে সময় নির্ধারণ করবেন না।
❌ পঞ্জিকা পরিবর্তন করে মাঝপথে অন্য পদ্ধতি গ্রহণ করবেন না।
এটাই ষষ্ঠীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলির একটি।
বোধনের জন্য প্রস্তুত রাখুন:
বেলুড় মঠের পদ্ধতিতে বোধনের সময় বিল্বগাছের গোড়ায় জলপূর্ণ তাম্রপাত্র স্থাপন, অথবা বর্তমানে প্রচলিতভাবে বিল্বশাখা পাত্রে রেখে দেবীর জাগরণের প্রার্থনা করা হয়। (Belur Math)
বোধন = জাগরণ।
অকালবোধনের ঐতিহ্যগত ব্যাখ্যায় শরৎকালে দেবীর জাগরণ ও পূজার সূচনা করা হয়। বেলুড় মঠও বোধনকে "awakening" হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। (Belur Math)
শুদ্ধিকরণ → ধ্যান → আবাহন → বিল্বশাখা/বিল্ববৃক্ষ পূজা → বোধন মন্ত্র → উপচার → প্রার্থনা
✔ পুরোহিতের মন্ত্র মন দিয়ে শুনুন।
✔ নির্দিষ্ট সময়ে পুষ্প/উপচার দিন।
✔ শঙ্খ ও ঘণ্টা নির্দিষ্ট সময়ে বাজান।
✔ ঢাকের ব্যবস্থা থাকলে পুরোহিতের সঙ্গে সময় মিলিয়ে নিন।
✔ পরিবেশ শান্ত রাখুন।
✔ দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখুন।
❌ পুরোহিতের মন্ত্রের মাঝখানে কথা বলবেন না।
❌ বিল্বশাখা অযথা হাতে হাতে ঘোরাবেন না।
❌ প্রতিমা স্পর্শ করবেন না।
❌ বোধনের সময় selfie/photoshoot করবেন না।
❌ মাইকে বিজ্ঞাপন চালাবেন না।
❌ পুরোহিতকে বারবার থামিয়ে ছবি তুলবেন না।
বেলুড় মঠের পদ্ধতিতে বোধনের পরে অধিবাস ও আমন্ত্রণ হয়। প্রথমে দেবী দুর্গা ও বিল্ববৃক্ষ/বিল্বশাখার পূজা করা হয়। এরপর ২৬টি মাঙ্গলিক দ্রব্য দেবী ও বিল্ববৃক্ষকে স্পর্শ করিয়ে পবিত্রীকরণের আচার করা হয়। তারপর পূজাবেদীর চারপাশে লাল সুতো বাঁধা হয়। (Belur Math)
২৬টি দ্রব্যের তালিকা সব পূজাপদ্ধতিতে একই নয়।
তাই এখানে "এই ২৬টিই সর্বজনীন"-এমন দাবি করা ঠিক হবে না।
বিভিন্ন বাংলা পূজা-পদ্ধতির প্রকাশিত তালিকায় অধিবাসের জন্য মাটি, গন্ধ, শিলা, ধান্য, দূর্বা, পুষ্প, ফল, দধি, ঘৃত, স্বস্তিক, সিঁদুর, শঙ্খ, গোরোচনা, শ্বেতসরিষা, স্বর্ণ, রৌপ্য, তাম্র, দীপ, দর্পণ ইত্যাদি পাওয়া যায়; অন্য পদ্ধতিতে অতিরিক্ত দ্রব্য যোগ হয়। (TN Station)
পুরোহিতের কাছ থেকে তাঁর নির্দিষ্ট ২৬ দ্রব্যের তালিকা আগে নিয়ে তারপর কেনাকাটা করুন।
এটি একটি procurement reference, কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতির বাধ্যতামূলক ২৬-দ্রব্যের শাস্ত্রীয় তালিকা নয়।
অধিবাসের পরে পূজাবেদীর চারপাশে লাল রঙের সূত্র বাঁধার কথা বেলুড় মঠের পদ্ধতিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। (Belur Math)
❌ পুরোহিতের অনুমতি ছাড়া সূত্র খুলবেন না।
❌ শিশুদের দিয়ে টানাটানি করতে দেবেন না।
আমন্ত্রণ = দেবীকে পরদিন সপ্তমীর পূজা গ্রহণের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে আমন্ত্রণ।
বেলুড় মঠের ব্যাখ্যায় অধিবাসের পর এই আমন্ত্রণ করা হয় এবং দেবীকে পরদিন সপ্তমীর পূজা গ্রহণ করার জন্য অনুরোধ করা হয়। (Belur Math)
বোধন
↓
অধিবাস
↓
আমন্ত্রণ
এই তিনটি বিষয়কে আলাদা আচার হিসেবে মনে রাখুন।
বেলুড় মঠের পদ্ধতিতে আমন্ত্রণের পরে দেবীকে পাঁচটি উপচারে পূজা করা হয় এবং তারপর আরতি হয়। (Belur Math)
তবে আপনার পুরোহিত যদি অন্য পদ্ধতি অনুসরণ করেন, তাঁর নির্দিষ্ট পদ্ধতিই অনুসরণ করবেন।
আগে থেকেই প্রস্তুত রাখুন:
কিছু বাংলা পূজাপদ্ধতিতে আরতির জন্য ৭, ৯ বা ১১ ধরনের সামগ্রীর প্রচলনও দেখা যায়। তাই এটিও পদ্ধতিনির্ভর। (Anulekhon)
ষষ্ঠীর জন্য আগে থেকে ঠিক করুন:
যদি রান্না করা ভোগ দেওয়া হয়, তবে আপনার পূজার প্রচলিত রীতি অনুসরণ করুন।
পুরোহিতের পদ্ধতি অনুযায়ী:
কোন বস্ত্র কখন অর্পণ হবে-পুরোহিত নির্ধারণ করবেন।
এখানে আয়োজকদের সবচেয়ে বেশি ভুল হয়।
ষষ্ঠীর রাতেই প্রস্তুত রাখুন:
নবপত্রিকার সুনির্দিষ্ট সংগ্রহ ও বাঁধাইয়ের নিয়ম আপনার পুরোহিতের পদ্ধতি অনুযায়ী করুন।
কিন্তু ষষ্ঠীতে নবপত্রিকা স্নান করাবেন না।
সেটি সপ্তমীর আচার।
ষষ্ঠী ও সপ্তমীর আচার আলাদা রাখুন।
দুর্গাপূজা বহুদিনের তিথিনির্ভর আচার।
"সময় কম, আজ সব করে দিই"-এই পদ্ধতি অনুসরণ করবেন না।
স্থানীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী বোধনের সময় ঠিক করুন।
একজন পুরোহিত যদি নির্দিষ্ট পদ্ধতি অনুসরণ করেন, মাঝপথে অন্য পদ্ধতির মন্ত্র/দ্রব্য ঢোকানো ঠিক নয়।
ষষ্ঠীর দুর্গাপূজা এবং ব্যক্তিগত দুর্গাষষ্ঠী ব্রত এক বিষয় নয়।
কেউ ব্রত/উপবাস করলে তা তাঁর পারিবারিক বা ব্যক্তিগত নিয়ম হতে পারে। অসুস্থ, বয়স্ক, শিশু বা ওষুধসেবী ব্যক্তিকে জোর করে উপবাস করানো উচিত নয়।
এতে পুরোহিতকে বারবার উঠে সামগ্রী আনতে হবে না।
একটি আলাদা বাক্সে রাখুন:
চন্দন | সিঁদুর | আতপ চাল | ধান | দূর্বা | বেলপাতা | ফুল | সুতো | তুলো | কর্পূর | দেশলাই/লাইটার | ছোট ছুরি | কাঁচি | পরিষ্কার কাপড় | চামচ | ছোট পাত্র | গঙ্গাজল | দক্ষিণা | কলম | পঞ্জিকা
এটি বাস্তবে অত্যন্ত কাজে দেয়।
বিশেষ করে বারোয়ারি পূজায়:
❌ জ্বলন্ত কর্পূর হাতে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে হাঁটবেন না।
❌ প্রদীপ কাপড়ের কাছে রাখবেন না।
❌ unattended ধূপ/দীপ রেখে যাবেন না।
এই ধারাটি বেলুড় মঠের প্রকাশিত ষষ্ঠী-পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। (Belur Math)
এখানে আমি ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বানানো/অনিশ্চিত ২৬-দ্রব্যের তালিকাকে "শাস্ত্রের একমাত্র সঠিক তালিকা" বলছি না। বেলুড় মঠ নিশ্চিতভাবে ২৬টি mangalik dravya ব্যবহারের কথা বলে, কিন্তু তাদের ওয়েবসাইটের বর্ণনায় সব ২৬টির নাম দেওয়া নেই। (Belur Math) অন্য বাংলা পূজা-পদ্ধতির তালিকায় দ্রব্যের সংযোজন-বিয়োজন দেখা যায়। (TN Station)
তাই আপনার বাস্তব পূজার জন্য সবচেয়ে নিরাপদ পদ্ধতি হলো: পুরোহিত যে পদ্ধতি/পঞ্জিকা অনুসরণ করবেন, সেই বইয়ের অধিবাস দ্রব্যের তালিকাটি হুবহু নিয়ে বাজারের checklist বানানো।
১৬ অক্টোবর ২০২৬ - ষষ্ঠী:
সকালে কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা, সন্ধ্যায় বোধন → অধিবাস → আমন্ত্রণ।
১৭ অক্টোবর - সপ্তমী: নবপত্রিকা-সংক্রান্ত আচার ও সপ্তমীর পূজা। এই দিনভিত্তিক কাঠামো ২০২৬-এর প্রকাশিত সূচিগুলির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সবশেষে: সময়ের ক্ষেত্রে অনলাইনের কোনও সাধারণ তালিকা নয়-আপনার পূজার স্থান যে পঞ্জিকা অনুসরণ করে, সেই পঞ্জিকার সময়ই চূড়ান্ত।
বেলুড় মঠের দুর্গাপূজা-পদ্ধতি (Belur Math)

